কোনো ভোট নিয়েই প্রশ্ন নেই: প্রধানমন্ত্রী

বর্তমান সরকারের আমলে স্থানীয় সরকারে ছয় হাজার নির্বাচনের একটি নিয়েও কোনো প্রশ্ন উঠেনি বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, দেশে নির্বাচনের কারচুপি শুরু করেছেন জিয়াউর রহমান। আর বিএনপি সিল মারতে না পারলে ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলে।

মঙ্গলবারের খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হারার পর বিএনপির কারচুপির অভিযোগ তোলার দুই দিন পর বৃহস্পতিবার এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তবে তিনি খুলনার নির্বাচনের কথা না তুলে সামগ্রিকভাব নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন।

জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বিএফইউজের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের এই সরকারের আমলে প্রায় ছয় হাজার লোকাল গভর্নমেন্ট ইলেকশন, অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, উপনির্বাচনসহ ছয় হাজারের মতো নির্বাচন হয়েছে। একটা নির্বাচন নিয়েও তো কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। কারণ আমরা হস্তক্ষেপ করি না, করব না আমরা। কারণ এটা জনগণের অধিকার। জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই।’

‘আমরা চাই দেশে একটা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসুক। সেটা ফিরে এসছে, এটেই যেন কেউ আর বানচাল করতে না পারে, নষ্ট করতে না পারে।’

বর্তমান সরকারের অধীনে কোনা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে নানা সময় অভিযোগ করে আসছে বিএনপি। এই অভিযোগের জবাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি জোর গলায় গণতন্ত্রের কথা বলে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হলো কি না, সে বক্তব্য দেয়। কিন্তু আমি যদি প্রশ্ন করি এ দেশে নির্বাচনকে কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে?’

‘জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে তার হ্যাঁ, না ভোট, তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বা ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন, প্রত্যেকটা নির্বাচনে ভোট চুরির প্রক্রিয়াটা সেই শুরু করেছিল।’

‘১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা আমাদের মনে আছে। কীভাবে বিএনপির সন্ত্রাসীরা সেই সময় ভোট বাক্স কেড়ে নেয়া, সিল মারা এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করা তারা করেছে।’

‘৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। সে নির্বাচনে সব দলই তা আমরা সবাই বর্জন করেছিলাম। ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছিল। মাত্র দেড় মাস থাকতে পেরেছিল। যেহেতু জনগণের ভোট কেড়ে নিয়েছিল। গণ অভ্যুত্থান হয়েছিল। ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল।’

‘পরবর্তীতে ২০০৬ সালে যে নির্বাচন। এক কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে ভোটার লিস্ট করে নির্বাচনের নামে যে প্রহসন করতে গিয়েছিল, তখনই দেশে ইমার্জেন্সি চালু হলো।’

‘কাজেই যার সব সময় জনগণের ভোট নিয়ে সব সময় ছিনিমিনি খেলেছে তাদের মুখেই নির্বাচন, গণতন্ত্র আবার নির্বাচনে সুষ্ঠুতার কথা আমাদের শুনতে হয়।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হতো কখন, যদি তারা ভোট সিল মারতে পারে। আপনাদের স্মরণ থাকার কথা মাগুরা উপনির্বাচনের কথা। সেই নির্বাচনে তারা কীভাবে ভোট চুরি করলেন এবং মানুষের ওপর কী অত্যাচার করেছিল। রক্তাক্ত মানুষগুলো কেঁদে বলেছিল তারা ভোট দিতে পারেনি।’

‘ঢাকার মিরপুর উপনির্বাচনের কথা একটু আমি স্মরণ করাতে চাই। এমনকি ঢাকা-১০ রমনা-তেজগাঁওয়ে নির্বাচন, যেখান থেকে ফালুকে জিনিয়ে নিয়ে আনল। কয়টা ভোটকেন্দ্রে মানুষ ভোট দিতে পেরেছে। একেকটা বাসে করে যাচ্ছে সিল মারছে, আবার সেখান থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছে, সিল মারছে, এটাই তো ছিল নির্বাচনের চেহারা। তারা এখন আবার তত্ত্বকথা শোনায় আর নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করে।’

বিএফইউজের এই সম্মেলনটি হচ্ছে ৩৭ বছর আগে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার দিনটিতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন বিদেশে। আর ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত করার পর ১৭ মে তিনি দেশে ফিরেন।

সে সময় দেশের কী পরিস্থিতি ছিল সেটি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ৮১ সালে ফিরে এসেছিলাম এই দিনে। এসে আমি কী দেখেছিলাম? প্রতি রাতে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে হবে, কারণ কারফিউ হয়ে যাবে।’

‘তার মনে, কারফিউ গণতন্ত্র দিয়েছে, জনগণের গণতন্ত্র তারা দেয়নি, এটা হচ্ছে বাস্তবতা। গণতন্ত্রের ভাষাও তারা বোঝে না।’

জিয়াউর রহমানের সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিষয়টি নিয়েও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘যারা যারা অন্ধকার পথে ক্ষমতায় আসে, অস্ত্র ঠেকিয়ে রাষ্ট্রপতি সায়েমকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসে, তারা আবার গণতন্ত্রটা কীভাবে দেয় বা গণতন্ত্রের চর্চা কীভাব হয়, সেটা আমি জানি না।’

‘আমরা জনগণের জন্য রাজনীতি করি। জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম আমরাই করেছি। এবং তা প্রতিষ্ঠা করেছি।’

বিএনপি যখন ভোটে পারে না, তখন ষড়যন্ত্রের পথ ধরে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘যেটা ঘটেছিল ২০১৪তে। সেটা তারা বুঝেছিল ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত যে উন্নয়ন হয়েছিল, তারা বুঝেছিল জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে। তখনই চক্রান্ত শুরু করেছিল যেন নির্বাচন আর না হয়।’

সুশীল সমাজের একটি অংশও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘সাথে সাথে কিছু আছে যারা দলও গঠন করতে পারে না, নির্বাচনও করতে পারে না। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েশটা তাদের আছে। যদি কোনো অবৈধ পন্থায় কেউ ক্ষমতা দখল করে অথবা ইমার্জেন্সি আসে, অথবা মিলিটারি রুলার দায়িত্ব নেয়, তখন তাদের গুরুত্বটা বাড়ে। তখন তারা একটা পতাকা পায়। এরা জ্ঞানী গুণি হয়েও এই ধরনের পাপ মন নিয়ে তারা কাজ করে।’