জরিমানার ৩০ শতাংশ পাবে ট্রাফিক পুলিশ

সড়কে অব্যবস্থাপনা ও অসহনীয় যানজট দূর করতে নানা সীমাবদ্ধতার পরও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। এই বিভাগের প্রায় চার হাজারেরও বেশি সদস্য রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নিয়মিত সড়কে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আগে দুইটি শিফটে কাজ করলেও, ব্যস্ততা বাড়ায় এখন তারা তিন শিফটে কাজ করছেন।

প্রতি শিফটে নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার কথা বলা হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৪-১৬ ঘণ্টাও রাস্তায় থাকতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশদের।

ট্রাফিক পুলিশদের দুর্ভোগ নিয়ে দু:খ প্রকাশ করেছেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া নিজেও। তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশে কর্মঘণ্টা থাকলেও আমাদের দেশে ট্রাফিকদের নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই। বিভিন্ন দেশে ডিজিটালভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হলেও, আজও আমাদের হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তারপরও আমরা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছি।

বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমন্টে স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম ও দিয়া খানম মিম নিহতের পর স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে। ওই আন্দোলনের মুখেই গত ৫ আগস্ট বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু করে পুলিশ।

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চলমান ট্রাফিক সপ্তাহের গত সাত দিনে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৪টি মামলা দিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯ হাজার ২২৩ টাকা। প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আদায় করা এই জরিমানার টাকা জমা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।

সম্প্রতি ট্রাফিক প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আদায় হওয়া জরিমানার ৩০ শতাংশ এ বিভাগে কর্মরতদের বরাদ্দের সুপারিশ করেছে ডিএমপি। এরইমধ্যে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব বরাবর একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া।

ডিএমপি কমিশনার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, বিশ্বের ব্যস্ততম শহরগুলোর অন্যতম রাজধানী ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন পুলিশের প্রায় চার হাজার সদস্য। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এ মহানগরীতে আয়তনের তুলনায় রাস্তাঘাট অপ্রতুল। ফলে যানজট এখানকার একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মাণাধীন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলো থেকে নিঃসৃত ধুলাবালি এবং যানবাহন ও কল-কারখানা সৃষ্ট বায়ু ও শব্দ দূষণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করার বিষয়টি অত্যন্ত দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া একজন ট্রাফিক পুলিশকে ঝড়, বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও তার দায়িত্ব পালন করে যেতে হচ্ছে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ঢাকায় প্রতিনিয়ত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। ফলে ট্রাফিক সদস্যদের প্রত্যেক পালায় (শিফটে) নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার ডিউটি শেষেও অতিরিক্ত ডিউটি করতে হচ্ছে। আগে ট্রাফিক সদস্যদের দুই পালায় ডিউটি করতে হলেও বর্তমানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের তিন পালায় ডিউটি করতে হচ্ছে। দিন-রাত তীব্র শব্দ ও সার্বক্ষণিক মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করার কারণে এ বিভাগের সদস্যদের অনেকেই মানসিক বৈকল্য, বধিরতা, ক্যান্সার, যক্ষ্মা, অপুষ্টিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ বিভাগের সদস্যদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা বাবদ ব্যয় পরিশোধ করে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটানো অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।

এই শহরের প্রাত্যহিক যান চলাচল নিশ্চিত করা, ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ আইনের প্রয়োগসহ ভিভিআইপি গমনাগমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজনে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ আস্থার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর ট্রাফিক বিভাগের সদস্যদের এই কর্মতৎপরতা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রশংসিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল কমিটি ফর ইন্টেলিজেন্স কো-অর্ডিনেশনের (এনসিআইসি) সভায় ট্রাফিক পুলিশদের এসব সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। সে সময় ট্রাফিক প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আদায় হওয়া মোট জরিমানার একটি অংশ প্রতি মাসে বিভাগীয় সদস্যদের বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

এই বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অন্য কোনো আর্থিক খাত হতে অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন পড়বে না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন ডিএমপি কমিশনার।

ডিএমপি কমিশনার আরো উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নির্দেশিত ট্রাফিক বিভাগের প্রসিকিউশনের মাধ্যমে প্রতিমাসের আদায় করা জরিমানার ৩০ শতাংশ এই বিভাগে কর্মরত সদস্যদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।

এদিকে অনুমোদন না হলেও মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক সদস্যরা এরইমধ্যে বিষয়টি জেনেছেন। এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক সদস্য পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, চাকরি যেহেতু করছি সেহেতু যে কোনো পরিস্থিতিতেই আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। কষ্ট এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এমন উদ্যোগ অবশ্যই আমাদের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা।