জলাতঙ্কের কারণে পৃথিবীতে প্রতি ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু

দেশে ৮৫ ভাগ জলাতঙ্ক রোগ গ্রামেই দেখা যায়। ভয়ংকর মরণব্যাধি জলাতঙ্ক, এ রোগে মৃত্যু অনিবার্য। জলাতঙ্কের কারণে পৃথিবীতে প্রতি ঘণ্টায় ৬ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে। বছরে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ মানুষ কুকুর ও অন্যান্য প্রাণির আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে। এতে বছরে সহস্রাধিক মানুষ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং এর পাশাপাশি অনেক গবাদি প্রাণি এ রোগে মারা যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আক্রমণকারী প্রাণিগুলোর মধ্যে রয়েছে কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বেজি, চিকা ও বানর অন্যতম। এসব প্রাণীর কামড়ের ফলে মানুষ ও অন্যান্য গবাদি পশুর জলাতঙ্ক হয়ে থাকে।

সরকারের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দিনে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ লোক চিকিৎসা নিতে আসেন। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৭ সালে ৫০ জন রোগীর মৃত্যু ঘটে। বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী মৃত্যুবরণ করে জলাতঙ্কে। বাংলাদেশে জলাতঙ্কে আক্রান্তদের মধ্যে ৮৫ থেকে ৯৯ শতাংশ কুকুরের কামড়ের শিকার হন। তবে পশু কামড়ালেই জলাতঙ্ক হবে এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। কারণ, আক্রমণকারী পশুকে অবশ্যই জলাতঙ্কের জীবাণু বাহক হতে হবে।
এদিকে গতকাল দেশে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি নানা উদ্যোগে পালন করা হয়। ২০০৭ সালে সর্বপ্রথম বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘জলাতঙ্ক অপরকে জানান, জীবন বাঁচান’।
জানা গেছে, ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জলাতঙ্ক মুক্ত করতে ২০১০ সাল থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক ব্যাধি শাখার (সিডিসি) উদ্যোগে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় জাতীয় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। যা ২০১৭ সালে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচিতে উন্নীত করা হয়। এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ২০১১ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে ১টি এবং জেলাপর্যায়ে একটি জেলা জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কেন্দ্রসহ মোট ৬৭টি কেন্দ্র চালু করা হয়। এসব কেন্দ্র থেকে কুকুর কামড়ের আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য জনবলের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিনামূল্যে ১ লাখ ৮০ হাজার ইনজেকশন এবং দুই লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ জনকে প্রাণীর কামড়ের চিকিৎসা প্রদান করা হয়। সারা দেশে এ পর্যন্ত ১০ লাখের অধিক রোগীকে এ সেবা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি শাখার উদ্যোগে ২০১১ সাল থেকে ৬ দশমিক ৫ লাখের অধিক কুকুরকে টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেনেটিক ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. উম্মে রুমান সিদ্দিকী বলেন, এ রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু অনিবার্য। তাই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। তিনি বলেন, কুকুর কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিকভাবে কাপড় কাঁচা সাবান দিয়ে ক্ষত স্থান বার বার ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব টিকা দিতে হবে। অনেকেই টিকার তিনটি ডোজ সম্পন্ন করে না। যে কারণে টিকা নেয়ার পরও অনেকের জলাতঙ্ক হয়। আমাদের গবেষণা মতে, দেশের ৭০ শতাংশ কুকুরকে তিন রাউন্ড টিকা দিতে পারলে একশ ভাগ জলাতঙ্ক মুক্ত হওয়া সম্ভব।
সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, জলাতঙ্ক একটি অবহেলিত রোগ। এটি মূলত মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে সে কারণে আক্রান্ত মানুষ পাগলের মতো আচরণ করে। ৮৫ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগ গ্রামেই দেখা যায়। তিনি বলেন, আগে জলাতঙ্কের টিকার মান তেমন ভালো ছিল না, কিন্তু বর্তমানে উন্নতমানের টিকা থাকায় এ রোগে আক্রান্তের হার আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।