ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য টাকা জমা দেয়ার হিড়িক

এইচ এম আলাউদ্দিন:: নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র বিক্ষোভ এবং পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে শেষ পর্যন্ত বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু করায় এর প্রভাব পড়েছে খুলনা বিআরটিএতে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএ খুলনা সার্কেলের পাশাপাশি বিভাগের ১০ জেলার প্রতিটি সার্কেল অফিসেই গত দু’দিনে দেখা গেছে যানবাহন মালিক-চালকদের ব্যাপক ভিড়। সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত অফিস করেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছেন। এজন্য দিনের কাজ শেষ করতে গিয়ে কোন কোন অফিসে রাত ১০টা বা তারও বেশি সময় কাজ করতে হচ্ছে। বিআরটিএ’র খুলনা সার্কেলের তথ্য মতে, গত তিনদিনে যে পরিমাণ পরীক্ষামূলক ড্রাইভিং লাইসেন্সের(লার্নার) আবেদন পড়েছে তা’ বিগত এক সপ্তাহের হিসাবকেও হার মানিয়েছে। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছেন, পুলিশের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে খুলনার বিভিন্ন স্থানে। ট্রাফিক সপ্তাহ মাত্র সাতদিন চললেও বিআরটিএ’র অভিযান অব্যাহত থাকবে আগামী ঈদ-উল-আযহা পর্যন্ত।
বিআরটিএ খুলনা সার্কেল অফিসে গিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দেখা যায়, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিরা কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেন করছেন, কেউ লাইসেন্স নবায়ন করছেন আবার কেউ যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশনের জন্য কাগজপত্র জমা দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে কোন কোন ব্যক্তি হয় ‘কেএমপি’ বা ‘জেলা পুলিশ’ লিখে মটর সাইকেল চালিয়ে আসলেও সেটিও চলমান অভিযানের মুখে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। জেলা পুলিশ সুপার এসএম শফিউল্লাহ অবশ্য এ প্রসঙ্গে বলেন, আগামী ৩১ আগষ্টের মধ্যে জেলা পুলিশের মটর সাইকেলসহ সকল যানবাহন রেজিষ্ট্রেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এজন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেসব মটর সাইকেল কেন্দ্রীয়ভাবে দেয়া হয়েছে সেগুলোর রেজিষ্ট্রেশন ঢাকা থেকে সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
পক্ষান্তরে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো: হুমায়ুন কবির বলেন, কেএমপির যেসব যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন নেই সেগুলোর রেজিষ্ট্রেশনের জন্য পত্র দেয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করে পাঠানো হলেই সব যানবাহন আপ-টু ডেট হয়ে যাবে। তবে কি পরিমান যানবাহন রেজিষ্ট্রেশনবিহীন রয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান জানাতে পারেননি তিনি।
এদিকে খুলনা বিআরটিএ’র সূত্রটি জানায়, সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে যানবাহনের নতুন রেজিষ্ট্রেশন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনের পরিমান উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। গত তিনদিনে খুলনা সার্কেলে ৪১২টিসহ বিভাগের ১০ জেলায় সর্বমোট এক হাজার ৪০৫টি আবেদন পড়েছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য। যেটি বিগত এক সপ্তাহের চেয়েও বেশি। একইভাবে খুলনা সার্কেলে ৩০টিসহ বিভাগে সর্বমোট ৭৩৮টি যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন হয়েছে। রোববার থেকে গত তিনদিনে বিভাগের ১০ জেলায় গাড়ির ফিটনেস নবায়ন হয়েছে ৩৬২টি এবং লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে ৭৬২টি।
বিআরটিএ’র বিভাগীয় কার্যালয়ের সূত্রটি জানায়, বিগত তিন দিনে খুলনায় ৪১২টি, যশোরে ২৫৫টি, কুষ্টিয়ায় ১৭০টি, চুয়াডাঙ্গায় ১৬৫টি, সাতক্ষীরায় ১৫২টি, ঝিনাইদহে ৯৭টি, বাগেরহাটে ৫৪টি, মাগুরায় ৪২টি, নড়াইলে ৩০টি এবং মেহেরপুরে ২৮টি ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন(লার্নার) জমা পড়েছে।
বিআরটিএ খুলনা সার্কেলের হিসাব মতে বর্তমানে সর্বমোট চার হাজার ৯৭১টি গাড়িরই ফিটনেস নেই। যদিও এর মধ্যে কিছু গাড়ি ইতোমধ্যে অকেজো হয়ে গেছে। খুলনা সার্কেলের সহকারী পরিচালক(ইঞ্জি:) মো: আবুল বাসার বলেন, ১৯৯০ সাল থেকে খুলনা সার্কেল থেকে ৬৯ হাজার ৭২টি মটর সাইকেলের রেজিষ্ট্রেশন দেয়া হয়েছে। এছাড়া বাস, মিনিবাস, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন দেয়া হয় ১৩ হাজার ৬২৪টির। যার মধ্যে বিগত এক বছরে চার হাজার ১৭৪টি গাড়ির ফিটনেস নবায়ন হলেও এখনও ফিটনেসবিহীন রয়েছে চার হাজার ৯৭১টির। সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী ও বিমান বাহিনী এই তিন বাহিনী ছাড়া অন্য কোন সংস্থার নাম ও নিজস্ব নম্বর লিখে যানবাহন পরিচালনার কোন নিয়ম নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি ‘রং প্রসেস’। যানবাহনের নিয়মই হচ্ছে কেনার সাথে সাথে রেজিষ্ট্রেশন করেই রাস্তায় নামাতে হবে। সরকারি যেসব সংস্থার গাড়ি প্রধান কার্যালয় বরাদ্দ দেয়া হয় সেই বরাদ্দপত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্র সংযুক্ত করলেই খুলনা বিআরটিএ সরকারি সংস্থাগুলোর যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন দিতে পারে বলেও জানান তিনি। আর বরাদ্দপত্র না থাকলে ঢাকা থেকেই রেজিষ্ট্রেশন করতে হবে।
যে কোন যানবাহনের ফিটনেস পরপর ১০ বছর নবায়ন না করা হলে বিআরটিএ’র সার্ভার থেকে সেগুলো মুছে ফেলা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে ক্ষেত্রে ওই গাড়ির রেজিষ্ট্রেশন আর কখনই করা সম্ভব হবে না। এজন্য যেসব যানবাহনের ফিটনেস ১০ বছর হচ্ছে তাদেরকে দ্রুত নবায়নের জন্যও তিনি অনুরোধ জানান।
পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নাম ব্যবহার করে মটর সাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলের বিষয়ে বিআরটিএ খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো: জিয়াউর রহমান বলেন, নম্বর প্লেটে নাম্বার ছাড়া অন্য কিছুই লেখার সুযোগ নেই। এ নিয়ে মেট্রো বা জেলা আরটিসির মিটিংয়েও কেউ কথা বলেননি। তবে তিনি বিষয়টি নিয়ে পুলিশের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন।
খুলনার যানবাহনের কাগজপত্র আপ-টু ডেট সম্পর্কে তিনি বলেন, শতকরা ৮০ ভাগ ট্রাকের কাগজপত্র ঠিক থাকলেও এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় যাত্রীবাহী বাসের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ ২০/৩০ ভাগ বাসেরই কাগজপত্র ঠিক নেই। এ সম্পর্কে মালিক সমিতি থেকে বাস মালিকদের চিঠি দেয়া হয়েছে। মালিকরা জরিমান মওকুফের যে আবেদন সরকারের কাছে করেছিলেন সেটি গ্রহণ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এজন্যই মালিক সমিতি থেকে চিঠি দিয়ে কাগজপত্র আপ-টু ডেট করার জন্য বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে অবশ্যই দক্ষ চালক ও ফিটনেস থাকা আবশ্যক। এজন্য পুলিশের পাশাপাশি বিআরটিএ’র নিয়মিত অভিযান চলছে। জেলা প্রশাসন থেকে দু’জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনার জন্য। এটি ইতিবাচক দিক। ম্যাজিষ্ট্রেট থাকলে ঈদ-উল-আযহা পর্যন্ত বিআরটিএ’র অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।