তিতলির পর ঘূর্ণিঝড় ‘গাজা’

সম্প্রতি ভারতের ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় তিতলি। তিতলির আঘাতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে আকাশের অবস্থা কিছুটা খারাপ থাকলেও ঘূর্ণিঝড়টি সরাসরি কোনো আঘাত করেনি। তিতলির পর যে ঘূর্ণিঝড়টি বঙ্গোপসাগর বা আরবসাগরের উপর সৃষ্টি হবে, তার নাম ‘গাজা’। এরকম আরও পরপর নয়টি ঘূর্ণিঝড়ের নাম এখনই ঠিক হয়ে রয়েছে।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত ভারতে আছড়ে পড়া সবথেকে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়টির কোনও নির্দিষ্ট নাম নেই। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসের ওই ঘূর্ণিঝড়টি ‘ওড়িশা সুপার সাইক্লোন’ নামেই পরিচিত। ওড়িশায় আছড়ে পড়ার কারণেই তার এই নাম। ওই সুপার সাইক্লোনে ওড়িশায় সরকারি হিসেবে প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এরথেকে অনেক বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে আছড়ে পড়া একটি ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে। প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এতে। এটি ‘ভোলা ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে পরিচিত। কারণ বাংলাদেশের ভোলা এলাকায় আছড়ে পড়েছিল ঘূর্ণিঝড়টি। খবর বর্তমানের।

ওয়ার্ল্ড মেটরিওলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) নির্দেশিকা অনুযায়ী উত্তর ভারত মহাসাগর এলাকায় সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলির নামকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৪ সাল থেকে। উত্তর ভারত মহাসাগর এলাকায় অবস্থিত আটটি দেশ এখানকার ঘূর্ণিঝড়গুলির নামকরণের দায়িত্ব পায়। দেশগুলি হল-বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।

কীভাবে নামকরণ করা হবে, সেটা ডব্লিউএমও ঠিক করে দেয়। আটটি দেশ প্রত্যেকে আটটি করে ঘূর্ণিঝড়ের নাম জমা দিয়েছে। অর্থাৎ মোট ৬৪টি ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ হয়ে রয়েছে। নামকরণ করার জন্য দেশগুলিকে ইংরেজি বর্ণ অনুযায়ী সাজানো হয়। ফলে বাংলাদেশ তালিকার প্রথমে ও থাইল্যান্ড শেষে আছে। দেশের তালিকা অনুযায়ী দেওয়া নাম পরপর আসতে থাকে। ধরা যাক তালিকার প্রথমে থাকা বাংলাদেশ একটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিল। তারপর ফের বাংলাদেশের নাম দেওয়ার সুযোগ আসবে সাতটি দেশের পর।

বিশ্বের অন্যান্য এলাকার তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলির নামকরণের প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকে চালু ছিল। ১৯৬০ এর দশকের মধ্যে উত্তর ভারত মহাসাগর এলাকা বাদে পৃথিবীর অন্যত্র সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলির নামকরণ ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়। এই এলাকায় এটা চালু হয় ২০০৪ সালে।

উত্তর ভারত মহাসাগর এলাকার মধ্যে বঙ্গোপসাগর ও আরবসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের চিহ্নিতকরণের সুবিধার জন্য এই নামকরণ করা হয়। অনেক সময় একই সময়ে একাধিক ঘূর্ণিঝড় বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয়। এগুলি সৃষ্টি হওয়ার পর অনেক দিন ধরে থাকে। নাম না থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই সাগরে কোনও নিম্নচাপ শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়া মাত্রই নাম দেওয়া হয়ে যায়।

ইংরেজি বর্ণক্রম অনুযায়ী প্রথমে থাকার সুবাদে উত্তর ভারত মহাসাগর এলাকার প্রথম ঘূর্ণিঝড় নামকরণের সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসের গোড়াতে আরব সাগরে সৃষ্টি হওয়া ওই ঘূর্ণিঝড়টির নাম ছিল ‘ওনিল’। গুজরাটের পোরবন্দর এলাকায় আছড়ে পড়লেও এর প্রভাবে গুজরাত ছাড়াও পাকিস্তানেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

আটটি দেশের দেওয়া ৬৪টি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে তিতলি ধরে মোট ৫৪টি ঘূর্ণিঝড় এই দেশগুলির কোথাও না কোথাও আছড়ে পড়েছে। বাকি আছে ১০টি। তিতলির পরে আসার পালা ‘গাজা’র। এই নামটি শ্রীলঙ্কার দেওয়া। এরপর আসবে থাইল্যান্ডের দেওয়া নামের ঘূর্ণিঝড় ‘ফেথাই’। এরপর পরপর আসবে বাংলাদেশের ‘ফণি’, ভারতের ‘বায়ু’, মালদ্বীপের ‘হিক্কা’, মায়ানমারের ‘কিয়ার’, ওমানের ‘মহা’, পাকিস্তানের ‘বুলবুল’, শ্রীলঙ্কার ‘পবন’ ও থাইল্যান্ডের ‘আমফান’। এরপর আটটি দেশ আবার নতুন করে নামের তালিকা দেবে। সেই অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক হবে।

বঙ্গোপসাগর ও আরবসাগরে বছরের দু’টি সময়ে মূলত ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। বর্ষা শুরুর আগে এপ্রিল-মে এবং বর্ষা চলে যাওয়ার পর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে। এবার বর্ষা পরবর্তী পর্যায়ে তিতলি ছাড়া আরও দু’টি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ‘দয়া’ বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি। আরব সাগরে সৃষ্টি হওয়া ‘লুবান’ বেশ কিছুদিন ধরে ফুঁসে অবশেষে ওমান-ইয়েমেন উপকূলে আছড়ে পড়তে চলেছে।

২০০৭ সালে বাংলাদেশে সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যুসহ ব্যাপক ক্ষতি করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। এই নামটি ছিল ওমানের দেওয়া।