তীরে এসে তরী ডোবাল বাংলাদেশ

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের ক্রিকেট দর্শকদের ভোর হলো একটু অন্যরকম আভা নিয়ে। গায়ানায় সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ। দিবারাত্রির ম্যাচ। বাংলাদেশ সময়ে যা বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় শুরু হয়ে শেষ হয় ভোরের আলো ফোটারও অনেক পরে। আর বৃহস্পতিবার যখন ভোরের আলো ফুটছিল, বাংলাদেশের দর্শকরদের চোখে রঙ্গিন হচ্ছিল সিরিজ জয়ের স্বপ্ন। কিন্তু মুঠো থেকে কী বিস্ময়করভাবে বেরিয়ে গেল ম্যাচ! ৩ রানে হেরে গেল বাংলাদেশ। ম্যাচসেরা হয়েছেন শিমরন হেটমেয়ার।

টস হেরে আগে ব্যাট করে ৪৯.৩ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডজ। জবাব দিতে নেমে প্রথমে সাকিব-তামিম ও পরে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর ব্যাটে ভর করে জয় দেখছিল টাইগাররা। শেষ দুই ওভারে বাংলাদেশের দরকার ছিল ১৪ রান। শেষ ওভারে ৮ রান। কিন্তু সেই সমীকরণ মিলাতে ব্যর্থ হলো টাইগাররা।

৪৯তম ওভারে ৬ রান নিতে পারলেও হারায় সাব্বির রহমানের উইকেট। শেষ ওভারে তাই ৮ রান প্রয়োজন পড়ে টাইগারদের। কিন্তু হোল্ডারের করা প্রথম বলেই ফিরে যান ৬৮ রান করা মুশফিক। পরের দুই বলে কোনো রানই নিতে পারলেন না মোসাদ্দেক হোসেন। শেষ ৩ বলে তাই ৮ রানের সমীকরণ দাঁড়ায়। কিন্তু মোসাদ্দেক-মাশরাফী নিতে পারলেন মাত্র ৪ রান। আর তাই ৩ রানের পরাজয় মানতে হলো টাইগারদের। ক্যারিবিয়রা সিরিজে ফিরলো ১-১ সমতায়।

অথচ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে কি দারুণ শুরুই না ছিল টাইগারদের। ঝড়ো শুরু করেন তামিম ইকবাল ও এনামুল হক বিজয়। আগের ম্যাচে ব্যর্থ হওয়া বিজয় ছিলেন বিস্ফোরক। তামিম-বিজয়ে প্রথম ওভারেই ১১ রান যোগ করে বাংলাদেশ। আলজারি জোসেফের করা প্রথম ওভারে একটি করে চার হাঁকান তামিম ও বিজয়। জেসন হোল্ডারের করা ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলে ১ রান নেন তামিম। বিজয় পরের দুই বলে একটি চার ও ছক্কা হাঁকান। শেষ বলে আবার হাঁকান ছক্কা।

তবে ইনিংসের তৃতীয় ও নিজের দ্বিতীয় ওভারে বল করতে এসেই সেই বিজয় ঝড় থামিয়েছেন জোসেফ। বিজয়কে বোল্ড করেন তিনি। মাত্র ৯ বলে ২ চার ও ২ ছক্কায় ২৩ রান করেন বিজয়।

এরপর প্রথম ম্যাচের মতোই সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের দারুণ এক জুটি হলো। এই দুজনের ব্যাটেই প্রথম ওয়ানডেতে জয় রচিত হয়েছিল টাইগারদের। সেই ম্যাচে আগে ব্যাট করে দ্বিতীয় উইকেটে দুজনে গড়েন ২০৭ রানের জুটি। এদিন অতোটা বড়ো হলো না। তবে দুজনে যোগ করেন ৯৭ রান। শুরুটা সাকিব-তামিম করলেন ঝড়ো। ১৫ ওভার শেষে তাই টাইগারদের রান ছিল ১ উইকেটে ১০১।

কিন্তু পরের ১৫ ওভারে বাংলাদেশের রানের গতি যায় থেমে। ৩০ ওভার শেষে টাইগারদের স্কোর দাঁড়ায় তাই ৩ উইকেটে ১৪৮। ৮৫ বলে ৬ চারে ৫৪ রান করে ফিরেন তামিম। ১৬ রানের ব্যবধানে ফিরে যান সাকিব আল হাসানও। ৭২ বলে ৫ চারে ৫৬ রান করেন তিনি।

তামিম-সাকিবের বিদায় এবং ওই সময়ের রান রেট থেমে যাওয়া। দুই মিলে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। তবে সেই চাপ সামাল দেন মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদউল্লাহ মিলে। চতুর্থ উইকেটে ৮৭ রান যোগ করেছেন এই দুজন। শেষ ৫ ওভারে যখন ৪০ রানে সমীকরণ দাঁড়ায় টাইগারদের সামনে তখন ৪৬তম ওভারের প্রথম বলেই ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট মাহমুদউল্লাহ। হোল্ডারের বলটা ঠিকঠাক খেলতে পারেননি মুশফিক। বল ছিল উইকেটের কাছাকাছিই। অন্যপ্রান্ত থেকে মাহমুদউল্লাহ দৌঁড়ে স্ট্রাইকিং প্রান্তে চলে যান। মুশফিক তখনো বেরই হনই উইকেট থেকে। কিছুটা বেড়িয়ে পরে এগিয়ে বিপদ বুঝে ফিরে যান মুশফিক। রান আউটে কাটা পড়েন মাহমুদউল্লাহ। ৫১ বলে ২ ছক্কায় ৩৯ রান করেছেন মাহমুদউল্লাহ।

এরপর পঞ্চম উইকেটে ৩২ রান যোগ করেন মুশফিক ও সাব্বির রহমান। ৪৯তম ওভারের শেষ বলে কিমো পলকে তোলে মারতে গিয়ে ফিরে যান সাব্বির। ১২ রান ফিরেন তিনি। তখনও কেউ কল্পনাও করেনি কি ঘটতে যাচ্ছে এম্যাচে। যা ঘটলো তাকে আসলে ভুতুড়ে ছাড়া অন্য কিছু উল্লেখ করা যায় না। সাব্বিরের পর মুশফিকের ফেরাতেই যেন ম্যাচ হেরে গেল টাইগাররা। ৬৭ বলে ৫ চার ও ১ ছক্কায় ৬৮ রান করেন মুশফিক। বৃহস্পতিবারের সকালটা তাই বাংলাদেশের দর্শকদের শেষ পর্যন্ত বিষন্নতার চাদরে ঢেরে দিয়ে গেল।

এরআগে বাংলাদেশের বোলিংয়ের শুরুটাও হলো দুর্দান্ত। উইকেটের আর্দ্রতাকে কাজে লাগাতে আগে বোলিং বেছে নেওয়া বাংলাদেশের। সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করতে অধিনায়ক মাশরাফী দায়িত্ব তোলে নিলেন কাঁধে। ১২ রান করা লুইসকে ফিরিয়ে তিনিই প্রথম জুটি ভাঙেন। এরপর ক্রিস গেইলকে ২৯ রানে ফেরান মেহেদী হাসান মিরাজ। দুটি আউটই ছিল এলবিডব্লিউ।

এরপর সাই হোপকে সাকিব আল হাসান ফিরিয়ে দিলে ৭৭ রানে ৩ উইকেট হারায় ক্যারিবিয়রা। ২৪তম ওভারে রুবেল হোসেনকে প্রথম আক্রমণে আনেন মাশরাফী। নিজের প্রথম ওভারেই অধিনায়ক ও দর্শকদের মুখে হাসি ফোটান রুবেল। ১২ রান করা জেসন মোহাম্মদকে ফিরিয়ে দেন রুবেল। ২৩.৫ ওভারে ১০২ রানে ৪ উইকেট হারায় ক্যারিবিয়রা।

তবে এরপর পঞ্চম উইকেটে ১০৩ রানের জুটি গড়েন শিমরন হেটমায়ার ও রোভমান পাওয়েল। এই জুটিতেই বড় চ্যালেঞ্জিং রানের ভিত্তি পায় ক্যারিবিয়রা। হেটমায়ার তুলে নেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে সবচেয়ে কম বছর বয়সে সেঞ্চুরির কীর্তি গড়েন এই ব্যাটসম্যান। ৯৩ বলে ১২৫ রান করে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন তিনি। ৫০ তম ওভারে রান আউট হওয়ার আগে নিজের ইনিংসটি তিনি সাজান ৩ চার ও ৭ ছক্কা।

ক্যারিবিয়দের রান আরো বেশি হতে পারতো। তবে রোভমান পাওয়েলকে রুবেল ৪৪ রানে ফিরিয়ে হেটমায়ারের সাথে জুটি ভাঙেন। এরপর দ্রুত উইকেট হারিয়েছে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে শেষ উইকেটে হেটমায়ার আলজারি জোসেফকে নিয়ে গড়েন ২৯ রানের জুটি। তাতেই লোয়ার মিডল অর্ডার ব্যর্থ হলেও ক্যারিবিয়রা ভালো পুঁজি পায়।

বাংলাদেশের পক্ষে রুবেল হোসেন সর্বাধিক ৩ উইকেট নেন। এছাড়া ২টি করে উইকেট নিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান ও সাকিব আল হাসান। ১টি করে উইকেট পেয়েছেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ও মেহেদী হাসান মিরাজ। ম্যাচ সেরা হয়েছেন সেঞ্চুরিয়ান শিমরন হেটমায়ার।