দেশের সবচেয়ে বড় দুর্গাপূজা হচ্ছে বাগেরহাটে

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সোমবার বোধনের মধ্যদিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসব। চলবে পাঁচ দিন ধরে। শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যেন বইছে উৎসবের আমেজ। বাগেরহাট জেলায় এবছর ৬২২টি পূজা মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। অধিকাংশ মণ্ডপের প্রতিমায় রঙ তুলির কাজ শেষ। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জার কাজ। বাগেরহাটের মণ্ডপে দুর্গাপুজা শুরুর একদিন আগেই ভিড় এড়াতে দেশি বিদেশি ভক্ত দর্শনার্থী দেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিমার পূজামণ্ডপে ভিড় করছেন।

গত এক যুগ ধরে বাগেরহাট জেলার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শারদীয় দুর্গোৎসবকে দেশবাসীর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। সবচেয়ে বেশি প্রতিমার দুর্গাপূজাটি প্রথম শুরু হয় জেলার ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের মোমতলা সার্বজনীন দুর্গা মণ্ডপে। তাদের দেখা দেখি এখন জেলার অনেক মণ্ডপে এই প্রতিযোগিতা চলছে। যার মধ্যে বর্তমানে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া আনন্দ আশ্রম সার্বজনীন পূজামণ্ডপ, চুলকাঠি সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপ ও ফকিরহাট উপজেলা সদরের সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপ উল্লেখযোগ্য। তবে গত আট বছর ধরে জেলা তথা দেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিমার দুর্গাপূজাটি ব্যক্তি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের শিকদার বাড়িতে।

বাগেরহাট শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে অজ পাড়াগাঁ বাগেরহাট সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের শিকদারবাড়ি। শিকদারবাড়ির এই ধরনের আয়োজনের বাগেরহাটের এই গ্রামটি এখন সবার কাছে সুপরিচিত। দুর্গাপূজা আসলে এই গ্রামটির কথা এখন আর কাউকে মনে করিয়ে দিতে হয় না। গত আট বছর আগে এই গ্রামের ব্যবসায়ী লিটন শিকদারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুর্গাপূজা উপলক্ষে তার মণ্ডপে প্রথমবার ১৫১টি প্রতিমা তৈরি করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেন। তারপর থেকে প্রতি বছরই এই মণ্ডপে প্রতিমার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এবছর পবিত্র ধর্মগ্রস্থ রামায়ণ, পুরাণ ও মহাভারতের নানা দেবদেবীর কাহিনি অবলম্বনে এই পূজামণ্ডপে মোট ৭০১টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিমা দেখতে আসা ভক্ত দর্শনার্থীরা এই প্রতিবেদককে বলেন,  সনাতন ধর্মের রামায়ণ ও মহাভারতে ধর্মের যে কল্পকাহিনি রয়েছে তা প্রতিমার মাধ্যমে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ধর্মের অনেক অজানা কাহিনি জানতে পারছি। আমরা সত্যি অভিভূত। ভিড় এড়াতে তাই পূজা শুরুর আগেই শিকদারবাড়ির আয়োজন দেখতে এসেছি।

ভারতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূজা দেখতে আসা দর্শনার্থী পূর্ণচন্দ্র মাইতি এবং উজ্জ্বল মণ্ডল এই প্রতিবেদককে বলেন. আগে জানতাম কোলকাতায় দুর্গাপুজায় বড় আয়োজন হয়ে থাকে কিন্তু বাংলাদেশের আয়োজন দেখে আমরা অভিভূত হয়েছি। আমাদের একটা ভুল ধারনা ছিল যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা দুর্গাপুজা সেভাবে করতে পারে না। কিন্তু আমাদের সেই ধারণা আজ পাল্টে গেল এই মণ্ডপ দেখে। এখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যে এতো বড় করে আয়োজন করে থাকে তা জানতাম না। সত্যিই আমরা মুগ্ধ হয়েছি।

আয়োজক ব্যবসায়ী লিটন শিকদার এই প্রতিবেদককে বলেন, নিন্ম মধ্যবিত্ত ঘরে আমার জন্ম। অজ পাড়াগাঁতে আমার বেড়ে ওঠা। আমার বাবা ছিলেন গ্রাম্য শৈল্য চিকিৎসক। জীবিকার তাগিদে আমি এক সময়ে বিদেশে পাড়ি জমাই। ছেলেবেলা থেকে আমি ধর্মপরায়ণ ছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল আমি যদি কখনো বেশি টাকা রোজগার করতে পারি, তাহলে আমার জন্মভূমিতে বছরে একবার বড় ধর্মীয় উৎসব করব। ঈশ্বর আমাকে বৈমূখ করেননি। তাই আমি ২০১০ সালে প্রথমে ১৫১টি দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করে শুরু করি। ঈশ্বরের ইচ্ছায় আমি এধরনের আয়োজন করতে পারছি। বাগেরহাট সেই থেকে দুর্গাপূজা আসলে এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা তা দর্শন করতে আসেন।

তিনি আরও বলেন, এখানে পূজা দেখতে আসা দর্শনার্থীদের পরিদর্শনে বইয়ে দেয়া মতামতের ভিত্তিতে অনুপ্রাণিত হয়ে এই মণ্ডপে প্রতিমার সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ানো হচ্ছে। এবছর ৭০১টি দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিকাল মিলিয়ে সনাতন ধর্মে কোটি কোটি দেবতা রয়েছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই দেবতাদের সম্পর্কে সবাই জানেন না। সনাতন ধর্মের ব্যাপকতা কত তা সবার কাছে তুলে ধরতে আমার এই আয়োজন।

প্রধান মৃৎশিল্পী বিজয় কৃষ্ণ বাছাড় বলছেন, গত বৈশাখ মাস থেকে ১৫ জন মৃৎশিল্পীদের নিয়ে এই মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করি। প্রতিমার রঙ তুলির কাজ শেষ হয়েছে। সোমবার বোধনের মধ্যে দিয়ে শারদীয় দুর্গাপুজা আরম্ভ হবে। সনাতন ধর্মকে এই প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই মুখ্য উদ্দেশ্যে।  দেশের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি প্রতিমার দুর্গাপুজা বলে দাবি করেন ওই শিল্পী।

বাগেরহাট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি অম্বরিশ রায় এই প্রতিবেদককে বলেন, এক যুগ আগে থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বাগেরহাটে শারদীয় দুর্গাপূজাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে বেশি প্রতিমা তৈরির প্রতিযোগিতায় নামেন। শুরু হয় বেতাগার মোমতলা সার্বজনীন মণ্ডপ দিয়ে। এরপর থেমে থাকেনি চুলকাঠি, কাড়াপাড়াসহ বিভিন্ন মণ্ডপও। তারই ধারাবাহিকতা গত আট বছর ধরে অজ পাড়াগাঁর ব্যবসায়ী লিটন শিকদার তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে শারদীয় দুর্গাপুজা মহাধূমধামে করে চলেছেন। এটি এখন দেশের সবচেয়ে বড় পূজা বলে ধারণা করা হয়। দুর্গাপূজা আসলে বাগেরহাট হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন। সব ধর্মের মানুষ শারদীয় দূর্গোৎসবে আনন্দে মেতে উঠুক সেই প্রত্যাশা ওই নেতার।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় এই প্রতিবেদককে বলেন, বাগেরহাট জেলায় এবছর ৬২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পাশাপাশি সিসি ক্যামেরায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দেয়া হবে। দেশের সবচেয়ে বড় দুর্গাপূজা হচ্ছে হাকিমপুর গ্রামের শিকদার বাড়িতে। এখানে দেড় শতাধিক পুলিশ মোতায়েন থাকছে বলে জানালেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।