নতুন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাচ্ছেন যারা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে অবিশ্বাস্য জয় পেয়েছে মহাজোট। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী ২৯৮ আসনের ২৮৮টিতেই জয়লাভ করেছে ক্ষমতাসীন এ জোট। ইতিমধ্যে এমপিদের শপথ শেষে সংসদ নেতাও বানিয়েছেন নির্বাচিতরা। এবার মন্ত্রিসভার দিকে নজর বা সরকার গঠনের পালা।

ইতিমধ্যে গণভবন, সচিবালয়, দলীয় কার্যালয় ও নেতাদের কার্যালয়সহ সব যায়গায় নানা গল্প শোনা যাচ্ছে। কারা থাকছেন এবারের মন্ত্রিসভায়? টানা তৃতীয় ক্যাবিনেটে কার কপাল খুলছে বা কার পুড়ছে? ঘুরে ফিরে আলোচনায় দলে ত্যাগী ও বিষয়ভিত্তিক এক্সপার্ট কিছু লোকের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এসবই গল্প; বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ছাড়া কেউই জানেন না বলেও সাফ বলে দিচ্ছেন গল্পকাররা।

ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান শরীক আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, গতবারের মতো এবারও কোয়ালিশন বা জাতীয় সরকার হবে। বিরোধী দল থেকেও অনেকের ঠাঁই হবে মন্ত্রিসভায়। এতে যুক্ত হবে একাধিক নতুন মুখ। ত্যাগী রাজনীতিক, প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন দফতরে অভিজ্ঞদের একটি তালিকা আছে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এবার টেকনোক্রেন্টসহ একাধিক দফতরে নতুন মুখ বসানো হতে পারে।

দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মন্ত্রিসভার বিষয়টি একেবারেই প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার এখতিয়ারে। তিনি তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অনুযায়ী মন্ত্রিসভা সাজাবেন।

তবে তারা বলছেন, স্বভাবত নবীন-প্রবীণের সমন্বয় থাকবে মন্ত্রিসভায়। এবার যেহেতু টানা তৃতীয়বারের সরকার; উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা স্থান পাবেন মন্ত্রিসভায়। তাছাড়া দলের আগামীর নেতৃত্ব সুদৃঢ় করতে অঞ্চলভেদে কিছু নতুন মুখও আসবে। এর মধ্যে দলে প্রবীণরাও মূল্যায়িত হবেন বলে আশা করছেন তারা।

এদিকে, নানা আলোচনা ও রাজনৈতিক ধারণা থেকে যে নামগুলো শোনা যাচ্ছে তার মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাচ্ছেন আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, ওবায়দুল কাদের, ফারুক খান, ড. আবদুর রাজ্জাকসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ কিছু নেতা। সিনিয়র কিছু নেতা ও গেলবারের মন্ত্রিসভার বেশ কিছু সদস্যকে রেখে দেয়া হতে পারে।

এ ছাড়াও যোগ্যতা, বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও আঞ্চলিক বিবেচনাসহ নানা হিসেবে ডজন খানেক নাম আলোচনায় আছে। এর মধ্যে যোগ্যতার বিবেচনায় বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালকে (লোটাস কামাল) অর্থমন্ত্রী করার আলোচনা আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হতে পারে কুমিল্লা সদরের এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারকে। তুখোড় বক্তা, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

দলের আগামীর নেতৃত্ব ও আঞ্চলিক উন্নয়ন বিবেচনায় ক্লিন ইমেজের রাজনীতিক ও আওয়ামী লীগের তিনবারের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং জয়পুরহাটের এমপি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বেশ এগিয়ে।

মিথ আসন হিসেবে খ্যাত সিলেট-১ থেকে নির্বাচিত অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিতের ভাই আবদুল মোমেন বেশ আলোচনায়। আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম আলোচনায়। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা আলোচিত মামলা মোকাবেলায় দক্ষ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকেও টেকনোক্রেন্ট কোটায় আনা হতে পারে আইন মন্ত্রণালয়ে।

স্বরাষ্ট্রে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদকে অনেকে ভাবছেন। তবে কিশোরগঞ্জ থেকে প্রয়াত রাষ্টপ্রতি জিল্লুর রহমান ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত নারীনেত্রী আইভি রহমানের সন্তান নাজমুল হাসান পাপনকে মন্ত্রী করা হলে নূর মোহাম্মদের সম্ভাবনা কম।

আঞ্চলিক রাজনীতি, ব্যবসা ও মিডিয়া মহলে বেশ দাপুটে নারায়ণগঞ্জের এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর গাজীও এবারে আলোচনায় আছেন। এক সময়ের তুখোড় আমলা ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এমপি র আ ম উবায়দুল মোক্তাদীর চৌধুরীও আঞ্চলিক হিসেবে এগিয়ে আছেন।

জাতীয় চার নেতার একজন তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমিও এবার মূল্যায়িত হতে পারেন।

তাছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল নিজ দফতরেই থাকলে টেকনোক্রেট কোটায় অর্থনীতিবিদ ড. ফরাসউদ্দিনকে চুজ করা হতে পারে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কানের চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত ক্যাবিনেটে মূল্যায়ন পেতে পারেন।

ক্রীড়াঙ্গণে আলোচিত ও ত্যাগী অধিনায়ক মাশরাফী বিন মর্তুজা, মানিকগঞ্জের নাঈমুর রহমান দুর্জয় ও খুলনার সালাম মোর্শেদী- এ তিনজনের একজনকে ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রণালয়ের জন্য বেছে নেয়া হতে পারে।

ঢাকা মহানগরের রাজনীতির জন্য একজন মন্ত্রী দেয়া হতে পারে। এর মধ্যে প্রবীণ সংসদ হাবিবুর রহমান মোল্লা নতুন মুখ হতে পারেন। অথবা সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার শূন্যতায় অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামকেও রেখে দেয়া হতে পারে।

মংলা বন্দরসহ নৌ-খাতের নানা উন্নতির বিবেচনায় শেখ পরিবারের সন্তান ও খুলনা থেকে নির্বাচিত শেখ জুয়েলকে মন্ত্রিসভায় আনা হতে পারে। সিরাজগঞ্জ থেকে ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্নাও আলোচনায় আছেন।

তাছাড়া ফরিদপুর অঞ্চল থেকে একজন, গাজীপুর জেলা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল থেকে একজন করে মন্ত্রিসভায় নেয়া হতে পারে। এ বিবেচনায় নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন, জাহিদ আহসান রাসেল, মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও দীপঙ্কর তালুকদার এগিয়ে আছেন।

এদিকে, ১৪ দল ও মহাজোটের অন্য শরীকদের মাঝেও নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে, ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ ফজলে হোসেন বাদশা, জাসদের শিরিন আখতার, জাপার জিএম কাদেরের বিষয়টি বেশ আলোচনায়। লক্ষ্মীপুর থেকে আঞ্চলিক ও জোটগত বিবেচনায় মেজর (অব.) মান্নানও যায়গা পেতে পারেন মন্ত্রিসভায়।

তবে সবই আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মর্জির ওপর নির্ভর করে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কেবিনেট কেমন হবে বিষয়টি একান্তই প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব বিষয়। পরিসর বড় হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিজয় যেহেতু বড়, ফলে প্রত্যাশাও অনেক বড়। কী হবে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ১০ তারিখের মধ্যে সবই দৃশ্যমান হবে।

এদিকে, আগামীর বিবেচনায় তরুণদের যায়গা করে দিতে বাদ পড়ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, বেসামরিক বিমান ও পরিবহন এবং পর্যটনমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামালসহ অনেকে।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপির বর্জনের মধ্যেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। ১২ জানুয়ারি গঠিত হয় নতুন মন্ত্রিসভা। তখন শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে ৪৮ সদস্যবিশিষ্ট নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। ওই সরকারে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৯ মন্ত্রী, ১৭ প্রতিমন্ত্রী এবং দুইজন উপমন্ত্রী ছিলেন।

পরে কয়েক দফা মন্ত্রিসভায় রদবদল আনা হলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার আকার দাঁড়ায় ৫২ সদস্যের।

এবার সংসদে নিজেদের সদস্য বাড়ার পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদেও সদস্য বাড়বে বলেই ধরে নিয়েছেন দলের নেতারা। এ জন্য আগ থেকেই অনেকে ফেসবুকে প্রচারণা শুরু করেছেন দফতর উল্লেখ করে।

আর যাই হোক, এবারের মন্ত্রিসভা আগের তুলনায় বড় ও আগামীর বিবেচনায় বেশ শক্ত হবে বলে আশাবাদ দলীয় নেতাদের।