প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন খুলনার নারী সমাজ

মোঃ সাহেব আলী:: বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সহযোগিতা পেয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন খুলনার নারী সমাজ। গৃহবধুর পরিচয় ছাড়িয়ে তারা কেউ ক্যাটারিং সার্ভিস দিচ্ছেন, কেউ দিয়েছেন বিউটি পার্লার,কারো আছে ব্যাগ তৈরির কারখানা। কেউ আবার করছেন পোশাক তৈরির কাজ।
খুলনা মহানগরীর ২৪ নং ওয়ার্ডের রায়পাড়ার বাসিন্দা সুরভী ফেরদৌসি। এম এ পাশ করেও বিয়ের পর ঘরেই বসে ছিলেন। ওষুধ ব্যবসায়ী স্বামী আসাদুজ্জামান-এর একার আয়ে সংসার কোনরকমে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু স্বচ্ছলতা ছিলো না। বান্ধবীদের কাছে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের খবর পেয়ে সুরভী যেন হঠাৎই নতুন পথের দিশা পেলেন।
খুলনা মহানগরীর মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সুরভী তিন মাস মেয়াদী খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি নিজের দক্ষতা কাজে লাগাতে শুরু করেন। ঘরে বসেই বিভিন্ন খাবার তৈরি করে ফেসবুকে পোস্ট দেন। এভাবে তার গ্রাহক তৈরি হয়ে যায়। সুরভি এখন স্বাবলম্বী।
সুরভী জানান, ফেসবুকে পোস্ট দেখেই সাড়া দিতে শুরু করেন আগ্রহীরা। জন্মদিন, এনগেজমেন্টের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানে কেক, চিকেন ফ্রাই এবং বিরিয়ানীসহ বিভিন্ন খাবার রান্নার অর্ডার পেতে থাকেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাবার তৈরী করে সরবরাহ করা এবং খাবার সুস্বাদু হওয়ায় ক্রমান্বয়ে অর্ডার বাড়তে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন আইটেমের অর্ডার পান সুরভী। নিত্য দিনের খরচ মিটিয়ে সুরভী এখন সংসারের জন্য কিছু সঞ্চয়ও করতে পারছেন।
সুরভী বলেন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ এবং স্বামীর সহযোগিতায় আমি আজ স্বাবলম্বী। এটা আমার অনেক বড় পাওয়া।
তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সুফল পাচ্ছেন খুলনার নারী সমাজ। তারা এখন আর ঘরে বসে নেই। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছেন। শহর থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত নারীদের জন্য কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর এসব কিছু সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে।
শুধু সুরভী ফেরদৌসি নন, খুলনা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিউটিফিকেশন প্রশিক্ষণ নিয়ে সোহানা ও ফাতেমা এবং দর্জি বিজ্ঞান ও অন্যান্য ট্রেডি প্রশিক্ষণ নিয়ে আফসিয়া, সন্ধ্যা বিশ্বাস, আশা রানী ও লিলি রানীসহ অনেকেই এখন পবিবারের হাল ধরেছেন।
খুলনা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা নার্গিস ফাতেমা জামিন জানান, খুলনা জেলা ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে মোট ৬ টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এগুলো হলো বিউটি ফিকেশন, দর্জ্জি বিজ্ঞান, বাটিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কাপড় ও চটের ব্যাগ তৈরী ও সূচী শিল্প। খুলনা জেলা ও উপজেলায় চলতি অর্থ বছরের মে মাস পর্যন্ত উপরে উল্লেখিত বিষয়ে মোট ৫ হাজার চার শ’ ৩৮ জন নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন কাজ করছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে এবং নারীর যথাযথ মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তিনি নারীর ক্ষমতায়নে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রথমবার সরকার গঠন করে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহন বাড়িয়েছেন। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে নারীদের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিটি নারীই স্বাবলম্বী হবে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বেও পিছিয়ে নেই খুলনার নারী সমাজ। খুলনায় ৯ জন নারী ভাইস চেয়ারম্যান, ১০ জন নারী কাউন্সিলর, জেলা পরিষদে পাঁচ জন নারী সদস্য, দু’টি পৌরসভায় ৬ জন নারী কমিশনার এবং ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনে ২০৪ জন নারী সদস্য নিজ নিজ এলাকায় সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত আসন ৭ এর নির্বাচিত নারী কাউন্সিলর মাহমুদা বেগম বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, সংসদ উপনেতা এবং স্পিকার নারী। জাতীয় সংসদে ২০ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত। তাছাড়া জাতীয় সংসদে এখন সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। এটা নারীদের জন্য অত্যন্ত উৎসাহব্যাঞ্জক।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিচারপতি, সচিব, উপাচার্য, জেলা প্রশাসক, পুুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা সফলতার সাথে কাজ করছেন। এ সব কিছুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান।
রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের (১,২,৩,৪) সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য বেবী রহমান বলেন, শেখ হাসিনা নারীর কার্যকর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যার ফলে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উদ্যোগ, মাতৃত্ব ও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, নারীর প্রতি সহিংসতা দমন, অকাল এবং বাল্যবিবাহ বন্ধ, রাজনীতি, প্রশাসন এবং নিরাপত্তা সর্বক্ষেত্রে নারীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারছেন।