ফিরে যেতে শর্ত বাড়াচ্ছে রোহিঙ্গারাও

জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতাদের সক্রিয়তা সত্ত্বেও শরণার্থী প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের নিয়মিত ছল-চাতুরি, অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের একের পর এক শর্তের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এর মধ্যে রোহিঙ্গারা আবার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্ত দিচ্ছে। বিদেশি কোনো প্রতিনিধি দল কক্সবাজার ক্যাম্পে গেলেই তারা এসব শর্তের কথা তুলে ধরছে।

এ কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে কোনও রকম আশার আলো দেখছেন না কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা। বরং সামাজিক বৈষম্যের কবলে পড়ে তারা ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছেন। আর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং রোহিঙ্গাদের বিপরীত মেরুতে অবস্থান, দুই পক্ষের গোপন আঁতাত কিনা সে প্রশ্নও তুলছেন তারা।

গত নয় মাস ধরে একের পর এক বিশ্ব নেতারা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা টেকনাফ-উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলো পরিদর্শন করেছেন।

সবশেষ সোম ও মঙ্গলবার জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যান রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজার সফর করেছেন। কিন্তু তাদের সফরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কোনও আভাস মিলছে না। বরং বিশ্বনেতাদের সফরে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্তের সংখ্যা বাড়িয়েই চলেছে।

ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, তারা মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে নাগরিক হিসেবে সম অধিকার, ধর্মীয় অধিকার, শিক্ষার অধিকার পেলেই রাখাইনে ফিরবে। এজন্য তারা জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় নিরাপত্তার মাধ্যমে মিয়ানমারে ফিরে শান্তিতে বসবাস করতে চায়।

আর মিয়ানমার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বারবার বললেও, কার্যত তারা সে ব্যাপারে আগ্রহী নয়।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রধান, যিনি সম্প্রতি রাখাইন সফর করেছেন, তিনিও জানালেন, রাখাইন রোহিঙ্গাদের ফেরতে উপযুক্ত নয়।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বৃহদাকারে হত্যা-ধর্ষন ও দমন-পীড়ন শুরু হলে তার পুরো চাপ এসে পড়ে বাংলাদেশের ওপর। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের দিকে ঢল নামে রোহিঙ্গাদের। এ সংখ্যা আট লাখের বেশি ছাড়িয়ে যায়। তাদের সবারই ঠাঁই হয় কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে।

রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বাংলাদেশ শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। এজন্য দেশটির সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে বিশ্বনেতাদের। কিন্তু এত কিছুর পরেও শুরু করা যায়নি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া।

এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার নমনীয় হবে বলে আশাবাদী কক্সবাজারের বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট নিজেদের কর্মক্ষেত্রে গিয়ে এই বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

শরণার্থী বিষয়ক কমিশনার আশাবাদী হলেও স্থানীয়দের মধ্যে এনিয়ে কোনও আশার আলো নেই। বরং মিয়ানমার এবং রোহিঙ্গারা পুরো বিষয়টিকে প্রলম্বিত করে তুলছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আদিল চৌধুরী বলেন, ‘এরা (রোহিঙ্গারা) একটার পর একটা দাবি দিতে থাকবেই। যেগুলো বাংলাদেশসহ বিশ্ব নেতৃত্বের পূরণ করা সম্ভব নয়। মূলত তারা যেতেই চাইবে না।’

এ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘দিনে দিনে রোহিঙ্গারা নতুন নতুন শর্ত দিচ্ছে। ফলে তাদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ার ব্যাপারে সন্দেহ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে।’

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার সরকার। সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে আশির দশক থেকেই বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু হয়। এর মাঝে কিছু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয় মিয়ানমার।

সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে একটি নিরাপত্তা চৌকিতে কথিত হামলার অভিযোগ তুলে সেনা অভিযানের নামে নৃশংসতা শুরু হলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এদের আশ্রয় হয়েছে কক্সবাজারে উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন ক্যাম্পে।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত খুঁজে পেয়েছে বলে জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন রোহিঙ্গা নিধনের ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ বলেও আখ্যা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা নিপীড়নকে জাতিগত নিধন বলে অভিহিত করেছে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সমস্ত অভিযোগই বরাবরের মতো অস্বীকার করে আসছে।