ভারতীয় গরু না আসলে বাংলাদেশের লাভ

কদিন পরই কোরবানির ঈদ। মুসলিম সম্প্রদায়ের পবিত্র এই উৎসবে আত্মত্যাগের স্মারক স্বরূপ হালাল পশু কোরবানি দেয়া হয়। কোরবানির মাধ্যমে যেমন ধর্মীয় বিধি পালন করা হয়, তেমনি কোরবানিকে ঘিরে চাঙা হয় বাংলাদেশের অর্থনীতিও। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভেতরের শক্তি গত কয়েকবছর ধরে ইতিবাচকভাবে প্রতিভাত হচ্ছে ঈদুল আযহাকে ঘিরে। ভারতীয় গরুর বৈধ-অবৈধ প্রবেশ কমে যাওয়ায় চাঙা হচ্ছে দেশীয় গুরুর বাজার।

ঈদ সামনে। তাই ভারতীয় গরু নিয়ে অনেক কথা হবে। এক শ্রেণির গণমাধ্যম বলবে, ভারতীয় গরু ছাড়া আমাদের ঈদ হবে না। আবার বিজেপির ছত্রচ্ছায়ায় সাম্প্রদায়িক জঙ্গিশক্তি শিবসেনা, আরএসএস কিংবা বজরং পার্টি ঈদ আসলেই গরু ও বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করে অবমাননাকর কথাবার্তা বলে। ভারতীয় গরু চোরা পথে আনতে গিয়ে অর্থের লেনদেনে এদিক-সেদিক হলে বিএসএফ গুলি করে বাংলাদেশি হত্যা করে। এতে দুদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়। সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়। চোরা পথে ভারতীয় গরুর প্রবেশ তাই নিরুৎসাহিত, পারলে সম্পূর্ণ বন্ধ করাই শ্রেয়।

বৈধ-অবৈধ উপায়ে ভারত গরু বা গোমাংস বেঁচে যত টাকা উপার্জন করে তার একটা বড় অংশ যায় বাংলাদেশ থেকে। অবৈধ উপায়ে ভারত থেকে গরু আসে নানা চোরাকারবারি সিন্ডিকেট হয়ে। এই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটে ভারতের সরকারি-বেসরকারি, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক নানা ব্যক্তি জড়িত থাকে। বাংলাদেশের চোরাকারবারিরা সীমান্তবর্তী রাজ্যে প্রবেশ করে সে গরু অবৈধভাবে আনতে যায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জানার বাইরে এই চোরাকারবার সংঘটিত হয়, এমনটি বলার সুযোগ নেই। গরু নিয়ে আসার সময় হিসেবে গড়মিল হলেই চলে বিএসএফের গুলি, মারা যায় বাংলাদেশি চোরাকারবারি। ভারতীয় অংশের যারা এই গরু চোরাচালানের সাথে যুক্ত এদেরকে নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কিছু করতে দেখা যায়না। সীমান্তে এভাবে মানুষ হত্যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এত মানুষ পৃথিবীর আর কোনো সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়না।

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো এমনভাবে সংবাদ প্রচার করে যেন বাংলাদেশ থেকে কিছু মানুষ ভারতে গরু চুরি করতে গিয়ে সঙ্গত (?) কারণে নিহত হয়েছে! চোরাচালানের মত অবৈধ প্রক্রিয়ায় উভয় দেশের মানুষ জড়িত থাকলেও কলঙ্ক নিতে হয় শুধু বাংলাদেশকে। চোরাচালানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বিএসএফ কখনো কখনো সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে, এতে প্রতিরোধ করে আমাদের বিজিবি। এতে তৈরি হয় আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক সংকট। তৈরি হয় দূরত্ব, যা উভয় দেশের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। দুই দেশের রাজনীতি, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গরু তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর থেকে গরু নিয়ে কারবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সাম্প্রদায়িক জঙ্গি শিবসেনা, আরএসএস, বজরং পার্টিসহ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির বিকাশে ভারতে গরুই যেন প্রধান চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিসমূহকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুরো ভারতে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র কায়েমের যে অপচেষ্টা করছে তার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে গরু। গরুর মাংস খেলে, হোটেলে-বাসায় ফ্রিজে রাখলে, ট্রাকে করে কোথাও গরু নিয়ে গেলে নিরীহ মুসলমানদের পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার মত একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গরু যেন সেখানে এক প্যারাডক্স হয়ে উঠেছে। একদিকে গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে মুসলিম মেরে ফেলা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে গরুর মাংস রপ্তানি করে ভারত বিশ্বে এক নম্বর স্থান অর্জন করেছে।

ভারতের জাতীয় পর্যায়ের ইংরেজি দৈনিক দ্যা হিন্দু পত্রিকায় ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া টপ ইন এক্সপোর্টিং বিফ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরুর মাংস রপ্তানিতে ভারতের পরেই আছে ব্রাজিল। ২০১৫ সালে ভারত দুই মিলিয়ন টনেরও বেশি গোমাংস রপ্তানি করেছে। অথচ ভারতের অনেকগুলো রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ! ভারত রাষ্ট্রের কী এক ডাবলস্ট্যান্ডার্ড ভূমিকা! সাম্প্রদায়িক কারণে অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, বিহার, ছত্তিসগড়, দিল্লী, গোয়া, গুজরাট, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, জুম্মু-কাশ্মির, ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটক, মধ্য প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখান্ড ইত্যাদি রাজ্যসমূহে গরু জবাই কিংবা গোমাংস ভক্ষণ আইনত দণ্ডনীয়। অথচ টনকে টন গো মাংস রপ্তানি করতে কোনো দোষ নেই! ধর্মের নামে এমন জোচ্চুরি মেনে নেয়া যায়না।

গত দুই/তিন ঈদে বাংলাদেশে ভারতীয় গরু কম এসেছে। কিছু গণমাধ্যম এই ভারতীয় গরু নিয়ে হাহাকার দেখিয়েছে। কিন্তু গ্রামের কৃষক সব শঙ্কা দূর করে দিয়েছে। দেশি কৃষক দেশি গরু দিয়ে বিদেশের উপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় অর্থনীতির শক্তি বের করে এনেছে। বাংলাদেশের মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় গরু না আসলে কোনো ক্ষতি হবে না বাংলাদেশের। সাময়িকভাবে দুই-এক মাস মাংসের দাম বাড়লেও পরে ধীরে ধীরে তা কমবে। স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে। এতে গরুর জন্য ভারতের উপর নির্ভরতা চলে যাবে। বছরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা বাঁচবে বাংলাদেশের।

দেশের মাংস ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সারা বছরে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ গরু জবাই হয়। শুধু কোরবানি ঈদে জবাই হয় ৫০-৫৫ লাখ গরু। এর সিংহভাগই (৭০-৮০ শতাংশ) আসে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। মাংস ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ গরু এসেছিল ভারত থেকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখে।

ভারত থেকে যদি গরু আমদানি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ১/২ মাস দেশে গরুর মাংসের দাম বেড়ে গেলেও প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে গরু এনে সাময়িক ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। তবে সরকার একটু বাড়তি মনোযোগ দিলেই বিদেশি গরুর উপর নির্ভরতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে খামারিদের একটি করে গরু বাছর ফ্রি দিয়ে পশু পালনে উৎসাহিত করলে ২০/৩০ শতাংশ গরুর ঘাটতি দূর করা তেমন বড় সমস্যা হবেনা বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন।

ভারত থেকে গরু আসা কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই বিকল্প বের করে নিয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। পরাশক্তি চীনের আশীর্বাদপুষ্ট মিয়ানমার ক্রমেই বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গরু রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠছে। কোরবানির ঈদ আসলে মিয়ানমার থেকেও গরু ও মহিষ ঝাঁকে ঝাঁকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশ এখন চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মৎস্য, সবজি উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর কাতারে। মাথাপিছু আয়সহ নানা সূচকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গ্রাফ আকাশমুখী। দুর্নীতি কমিয়ে সর্বক্ষেত্রে সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সামর্থ্য রাখে। দরকার শুধু রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের একটু সাহসী ও সুদূরপ্রসারী নানা নীতি, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু না এলেও বৃহত্তর চট্টগ্রামে কোরবানিতে কোনো সংকট হচ্ছে না। চট্টগ্রাম অঞ্চলের খামার ও কৃষকের বাড়িতে পর্যাপ্ত গরু-ছাগল ও মহিষ প্রস্তুত রয়েছে। ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দাবি অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবেই এবার চাহিদার সমপরিমাণ প্রায় ৫ লাখ পশু প্রস্তুত ছিল। মূলত কোরবানির ঈদ সামনে রেখে স্থানীয় খামার ও পারিবারিকভাবে এ সব পশু লালন-পালন করা হয়েছে। তবে শুধু কোরবানির ঈদ নয়, সারাবছরই চাহিদা অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে পশুর সরবরাহ নিশ্চিত করতে সঠিক পরিকল্পনা ও খামারিদের সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের অন্য এলাকার তুলনায় চট্টগ্রামে কোরবানি ঈদে গরুর চাহিদা বেশি থাকে। এই অঞ্চলের লোকজন একাধিক গরু কোরবানি দেন। অনেকে আত্মীয়-স্বজনদের মাঝেও কোরবানির গরু বিলি করেন। ফলে এখানে গরুর চাহিদা বেশি থাকে। সরকারি হিসাবে গেল বছর চট্টগ্রামে কোরবানি দেয়া হয় ৪ লাখ ৯৩ হাজার পশু। বিদেশ থেকে তেমন আমদানি না হওয়া যার ৯০ ভাগই ছিল দেশি। তবে শেষ সময়ে মিয়ানমার থেকে বেশকিছু গরু আমদানি করা হয়েছিল।

এদিকে স্থানীয়ভাবে পশু পালনের এই উদ্যোগকে সামনেও ধরে রাখার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পশুর চাহিদা মেটাতে হলে দরকার পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। তাহলে চাঙা হবে গ্রামীণ অর্থনীতি।

২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গোখামারি, চাষি ও ব্যবসায়ীরা এবারের কোরবানির ঈদে গরু বিক্রি করে প্রায় ৩০ কোটি টাকা লাভ করেছেন। ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে গরু তেমন না আসায় দেশি ছোট-বড় ও হাইব্রিড জাতের গরু ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্টরা অতীতের লোকসান অনেকটা কাটিয়ে উঠেছেন। ফলে এ অঞ্চলের রুগ্ন ডেইরি খাতও চাঙা হয়ে উঠছে। পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের খামারি ও চাষিরা ক্রসজাতের পাবনা ব্রিড, অস্ট্রেলিয়ান-ফ্রিজিয়ান, ইন্ডিয়ান হরিয়াণ, পাকিস্তানি সাহিয়াল ও দেশি জাতের গরু পালন করেন। সারা দেশে এ অঞ্চলের গরুর খ্যাতি ও চাহিদা রয়েছে। গোখামারি ও চাষিরা কোরবানির বাজার ধরার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় দুই লক্ষাধিক গরু সরবরাহ করেন এবং স্থানীয় পশুরহাটে বিক্রি করে থাকেন। গরুর ব্যবসায়ীরা খামারি ও চাষিদের বাড়ি থেকে গরু কিনে বিক্রির জন্য ঢাকা, সিলেট, চিটাগাংসহ বিভিন্ন জেলার পশুরহাটে নিয়ে বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু বৈধ-অবৈধ পথে প্রচুর গরু ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে আসলেই দেশি গরু অবিক্রিত থেকে যায়। এতে গোখামারি, চাষি ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

গরু ব্যবসায়ীরা জানান, বিদেশি গরু দেশে যত কম আসবে খামারি ও চাষিরা তত বেশি লাভবান হবেন। দেশে গরু পালন বাড়বে।