রাখাইন পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে সামলানো যেত: সু চি

সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে অবশেষে বোধোদয় হয়েছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের শরণার্থী জীবনের এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর সু চি বলেছেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি তার সরকার আরো ভালোভাবে সামলাতে পারত। বৃহস্পতিবার ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে এ কথা বলেন তিনি।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলিম জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে আশির দশক থেকেই দমন-পীড়ন চালায় মিয়ানমার। তখন থেকে সেনা অভিযানের মুখে বাংলাদেশের দিকে ছুটে এসেছে রোহিঙ্গারা।

তবে গত বছরের আগস্টে সেনা অভিযানে হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতনের মুখে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলাদেশে। কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময় আসা আরও প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বাংলাদেশে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘসহ গোটা বিশ্ব উদ্বেগ জানিয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর সহায়তায় এগিয়ে এসেছে সবাই। সেই সঙ্গে তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত থাকলেও মিয়ানমার নিজ দেশের মানুষদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে টালবাহানা করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক ও একটি চুক্তি করার পরও প্রত্যাবাসন শুরু করছে না দেশটি।

প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে অবস্থান নিলেও মুখ খোলেননি সু চি। উল্টো নিজ দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে সাফাই গান তিনি। সবশেষ তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ‘বাংলাদেশের অসহযোগিতা’ ছিল বলে দাবি করেছিলেন। এমন স্ববিরোধী অবস্থানের কারণে তুমুল সমালোচিত হওয়ার পর সু চি বৃহস্পতিবার স্বীকার করে নেন, তার সরকার ও প্রশাসন আরও ভালোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতো।

হ্যানয়ে আসিয়ান নিয়ে ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য আমাদের সব পক্ষকে স্বচ্ছ হতে হবে। কেবল নির্দিষ্ট কোনো পক্ষকে আইনের শাসনে সুরক্ষা দেওয়ার কথা আমরা বলতে পারি না। তবে যেটা বোঝা যাচ্ছে, আমাদের সরকার পরিস্থিতি যেকোনো পন্থায়ই আরও ভালোভাবে সামাল দিতে পারতো।’

সু চি রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের কারাদণ্ড নিয়েও কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, এই মামলাটির বাকস্বাধীনতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। সাংবাদিক হওয়ার কারণে ওয়া লোন ও কিয়াও সোয়ে ও-কে সাজা দেওয়া হয়নি।

রয়টার্স জানায়, রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নির্যাতন, গণহত্যার ছবি তোলা এবং সংবাদ প্রকাশ করায় দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে মিয়ানমার সরকার।

মিয়ানমারের নেত্রী বলেন, ‘আমার আশ্চর্য লাগে, অনেক লোক হয়তো রায়ের পুরো সারসংক্ষেপ পড়েই দেখেনি। রায়ের সঙ্গে বাকস্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই। এটার সঙ্গে সরকারি গোপনীয়তা আইনের সম্পর্ক রয়েছে।’

সু চি বলেন, ‘আমরা যদি আইনের শাসনে বিশ্বাস করি, তাদের (দুই সাংবাদিক) অধিকার আছে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার এবং তারা দেখাবেন যে রায় কেন ভুল হয়েছে।’

রয়টার্স জানাচ্ছে, গত বছরের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত সহিংসতা-নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে সু চির যে উঁচু অবস্থান ছিল, সেখান থেকে তার পতন হয়। ১৯৯১ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়া সু চির অনেক আন্তর্জাতিক খেতাব, সম্মান কেড়ে নেওয়া হয়-রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে না পারায়।