শিশুর ইন্টারনেট আসক্তি কমবে যেভাবে

‘আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ’- এই কথার গুরুত্ব বা সারকথা কিন্তু অনেক গভীর। আমরা সবাই আমাদের ভবিষ্যৎকে অর্থাৎ আগামীর দিনগুলোকে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত দেখতে চাই। কিন্তু শুধু চাইলেই তো হবে না। সেই চাওয়া অনুরূপ কাজও করতে হবে। ভালো ফল পেতে চাইলে ভালো বীজও বপন করতে হয়।

সেই বীজ থেকে ভালো গাছ হবে, তবেই তো পাওয়া সম্ভব ভালো ফল। অর্থাৎ সন্তানকে সুষ্ঠুভাবে লালন করতে হবে। তবে বর্তমানে সময়ের যে প্রান্তে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে থেকে একটি শিশুকে সঠিকভাবে লালন-পালন করে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ।

কারণ বর্তমানে সুইচ টিপলে আলো জ্বলে, পাখা ঘোরে, পানি পড়ে, গান বাজে, ছবি আসে, নিমিষেই উড়া যায় আকাশ নীলে, গুঁড়া হাড় জোড়া লাগানো যায় চোখের সামনে। আর এ সবই সম্ভব হচ্ছে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বদৌলতে। সম্ভবত এ কারণেই মাদাম পিয়ারে কুরী বলেছিলেন, ‘আমার চোখের বিজ্ঞান হল অনিন্দ্য সুন্দর’।

এই অনিন্দ্য সুন্দর বিজ্ঞানেরই অবদান হচ্ছে বর্তমান ডিজিটাল যুগ। ইন্টারনেট যার ডাক নাম। ইন্টারনেট দৈনন্দিন জীবনটাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। এক কথায় পৃথিবী একেবারে তর্জনী আঙ্গুলের মাথায়। ক্লিক করলেই ব্যাস…। যে কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে, অবসর কাটাতে, প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডা কিংবা ভার্চুয়াল জগতের খোঁজ নিতে ইন্টারনেটের বিকল্প নেই।

একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাব আমরা সবাই আমাদের অবসর যাপনের অনেকটা সময় ব্যয় করছি এই ইন্টারনেটের পেছনে, যার মারাত্মক কুফল হিসেবে দেখা দিয়েছে শিশুদের ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি। যে সব বাচ্চা স্মার্টফোন তথা ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত এবং দিনের বেশকিছু সময় অতিবাহিত করে এই ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে তাদের একটা নামকরণও করা হয়েছে। আর তা হল স্ক্রিনজার। এই স্ক্রিনজার বাচ্চাদের জীবন এখন নানারকম হুমকির সম্মুখীন। এরা বিকালে মাঠে খেলতে যেতে পছন্দ করে না। প্রকৃতির সবুজ রঙ তাদের দৃষ্টি কাড়ে না।

সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে বসে মোবাইল অথবা ট্যাবে ব্যস্ত থাকে। এতে করে বাচ্চাদের ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে আর দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে, যা রীতিমতো চিন্তার বিষয়। এই বাচ্চারা কোনো অনুষ্ঠানে গেলেও তাদের চোখ স্থির থাকে মোবাইলে। একই রুমে বসে একজন অন্যজনের সঙ্গে কথা বলে না। কারণ একটাই- প্রযুক্তির ব্যবহার। ফলে তারা অনেকাংশেই অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে। সময়ের আগে অনেক কিছুই তাদের চিন্তা-চেতনাকে যেমন আবিষ্ট করছে, তেমনি ব্লু হোয়েলের মতো অদ্ভুত ভয়ঙ্কর কিছু গেম যা অনেক বাবা-মাকেই ভয়াবহ দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

নিত্যনতুন তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাটা অবশ্যই ভালো, তবে তা যদি বাচ্চাদের অবসর যাপন অথবা খেলাধুলার একমাত্র সঙ্গী হয়, তবে তা কিন্তু চিন্তার বিষয় অবশ্যই। সময় থাকতেই এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে বাবা-মাকেই। কারণ এই যে ইন্টারনেট, এর আসক্তি কিন্তু ভয়াবহ। অনেক সৌন্দর্যের মধ্যে থাকা কালো তিলের মতো।

শিশুর ইন্টারনেট আসক্তি কাটাতে হলে বাবা-মাকেই কিছু বিষয় খেয়াল করতে হবে। যেমন বাবা-মাই যদি সারাক্ষণ মোবাইলে চ্যাট করে অথবা সোসাল সাইটে ব্যস্ত থাকে, তাহলে বাচ্চাদের কাছে এটিকে স্বাভাবিক মনে হওয়াটাই কিন্তু স্বাভাবিক। তাই সন্তানের নেশা কাটানোর জন্য বাবা-মার নিজেদেরই মোবাইল ব্যবহার কমাতে হবে। অন্তত বাচ্চাদের সামনে একেবারে প্রয়োজনটুকু ছাড়া মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহার না করাই ভালো।

বোঝার মতো বয়স হলেই বাচ্চাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে যে, মোবাইল ফোন খেলার জিনিস নয়। ইন্টারনেট শুধু কার্টুন ও গান দেখার জন্য নয়। এগুলোর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীতা অনেক। কোনো পার্টিতে গেলে, অথবা বাইরে বের হলেই বেশিরভাগ বাচ্চার হাতেই যখন মোবাইল এবং ওদের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তুই যখন এই ইন্টারনেট ব্যবহার, তখন আপনি আপনার বাচ্চাকে একেবারে শতভাগ দূরে রাখতে পারবেন না এই প্রযুক্তি থেকে। আর তা ঠিকও হবে না। এ ক্ষেত্রে বাচ্চার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করা যেতে পারে।

দিনে আধা ঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিট সে মোবাইল গেম খেলতে পারবে। আর হোমওয়ার্ক শেষে ইন্টারনেট ব্রাউজ করবে ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এই সময় মোবাইলে কিডস মোড অন করে দিতে পারলে ভালো। তাহলে শিশু কি গেম খেলছে আর ইন্টারনেটে কি সার্চ দিচ্ছে তা আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। নিজের কোনো পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখলেও কিন্তু বাচ্চা যখন-তখন মোবাইল নিয়ে খেলতে পারবে না।

বাচ্চাদের খেলার সময় ও অবসর সময়ের প্ল্যানটি সঠিকভাবে করতে হবে। সামনে যদি খেলার মাঠ থাকে সেখানে বিকাল বেলা বাচ্চাকে খেলতে পাঠালে সে প্রকৃতির সান্নিধ্যও পাবে আর অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে তার সামাজিক দিকটাও উন্নত হবে আর অবসর সময়ে গান, নাচ, কবিতা, ছবি আঁকা এগুলোর চর্চা করাতে পারলে খুবই ভালো। আজকাল পড়াশোনার পাশাপাশি এগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে স্কুল-কলেজগুলোতেও। সব থেকে বড় কথা মোবাইল ও ইন্টানেটের অপব্যবহার থেকে বাচ্চা দূরে থাকবে।

অফিস থেকে ফিরে বাচ্চাদের কোয়ালিটি টাইম দিতে হবে। স্কুলে কি হয়েছে, পড়াশোনা থেকে শুরু করে খেলাধুলা সব বিষয়েই আলোচনা করতে হবে। তাহলে আপনি অনেক কিছু জানতেও পারবেন আপনার অনুপস্থিতির সময় সম্পর্কে। বাচ্চাকে পড়াতে বসে বাবা-মা নিজেই যদি মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকেন, তাহলে সন্তান মনোযোগ দিয়ে পড়বে- এটা আশা করাটা ঠিক হবে না। এতে বাচ্চা যদি পড়া থেকে উঠে যায় অথবা সেও মোবাইলে গেম খেলতে শুরু করে অথবা কার্টুন দেখবে বলে জেদ করে, তবে কিন্তু আপনার সন্তানকে দোষ দেয়া যাবে না। সন্তান যখন পড়ছে, তখন নিজেও পড়ুন। সবচেয়ে ভালো হয় বাচ্চার পাশে কিছু সময় বসে থেকে ওর পড়া ও লেখায় মনোনিবেশ করা। এতে বাচ্চারও পড়ার প্রতি মনোযোগ বাড়বে। বাবা-মারই তো উচিত সন্তানের সামনে নিজেকে রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করানো।

অনেক বাড়িতেই আজকাল ছোট্ট শিশুটিকে খাওয়ানোর মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে মোবাইল। অর্থাৎ ইন্টারনেটে ভেসে আসা রংবেরংয়ের নাচগান, কার্টুন, ছড়া। পন্থাটা সহজ কিন্তু সমস্যার বীজ কিন্তু রোপণ করা হয়ে গেল। বাচ্চা যতই বড় হবে তার আসক্তি ততই কিন্তু বাড়তে থাকবে। এই ইন্টারনেট ছাড়াও যে কতকিছু করার আছে, তা বাচ্চাদের বোঝাতে হবে। সত্যি কথা বলতে বর্তমানে যুগ যা দাঁড়িয়েছে এই সমস্যাটার সমাধান বের করা খুবই কঠিন। তাই বলে অসম্ভব তো নয়। বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য বা ভোলানোর জন্য ওই যন্ত্রটির ব্যবহার না করে নিজেরাই গান করুন, ছড়া শোনান। প্রয়োজনে তাকে একটু বাইরে থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসুন।

ইন্টারনেটের সবটাই যে খারাপ, তা কিন্তু কোনোভাবেই বলা যাবে না। তবে তার অপপ্রয়োগ যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখাটাই মূল কথা। সঠিকভাবে এর প্রয়োগ করতে পারলে এটি ছোটদের শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। যেমন- ফোনে বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ ডাউনলোড করা যেতে পারে। ল্যাপটপে ওয়ার্ড বা পাওয়ার পয়েন্টের ছোটখাটো কাজ বাচ্চাকে শেখানো যেতে পারে।

তাছাড়া আজকাল বিভিন্ন ভিডিও শেয়ারিং সাইটে নানাধরনের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান থাকে যাতে ছবি আঁকা, কবিতা আবৃত্তি এগুলো শেখানো হয়। সেই দিকগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে অনেক ভালো। ভূগোল বই পড়ার সময়, ল্যাপটপে মানচিত্র বা উপযোগী ছবি দেখানো, এভারেস্ট নিয়ে পড়ার সময় বাচ্চাকে এভারেস্টের ছবি দেখানো কিংবা এভারেস্ট অভিযাত্রীরা কীভাবে অভিযান করেন তার ভিডিও দেখানো যেতে পারে। এতে পড়াশোনা ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠবে এবং বাচ্চারও ভালো লাগবে।

দিনের কোনো একটা সময় বাচ্চার সঙ্গে বাবা-মার একান্ত সময় কাটাতে হবে। বাচ্চাকে কাছে টেনে নিয়ে একসঙ্গে সারা দিনের গল্প করুন, এই স্পর্শ, আদরগুলো অনেক জরুরি। আর এতে করে তার সঙ্গে আপনার বন্ধনটাও গাঢ় হবে। অনেক না বলা কথা সে সহজেই বলে ফেলবে আপনাদের কাছে। এতে করে অনেক অজানা বিষয় জানা হয়ে যাবে এবং বাচ্চার মধ্যে কোনো ভুল চিন্তা-ভাবনা থাকলে তা শুধরে দেয়া সম্ভব হবে। রাতে ঘুমানোর আগে, বাচ্চাদের সঙ্গে বালিশ নিয়ে খেলা করা যেতে পারে। গল্পের বই পড়ে শোনানো যেতে পারে এতে করে বাচ্চার বই পড়ার মতো ভালো অভ্যাস তৈরি হবে। ধর্মীয় জ্ঞানও কিন্তু জরুরি বাচ্চাদের জন্য। ছোট থেকেই বাচ্চাদের যার যার ধর্মীয় নিয়মগুলো শেখাতে হবে। বিকল্পের কিন্তু অভাব নেই। শুধু বাচ্চাকে একটু বুদ্ধি করে ব্যস্ত রাখতে হবে। আর এই সময়টুকু বাবা-মাকেও মোবাইল থেকে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া দূরে থাকতে হবে। আর এগুলো মেনে চলতে পারলেই আজকের শিশুটিকে ভবিষ্যতের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।