৪ কোটির বেশি শিশুকে ওষুধ সেবনের টার্গেট

আগামী ১লা থেকে ৭ই অক্টোবর দেশে ২১তম জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ শুরু হচ্ছে। এবার ওষুধ সেবনকারী শিশুর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে এই সপ্তাহ পালন ও ক্ষুদে ডাক্তারদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। দেশের প্রাথমিক পর্যায়ের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির মাধ্যমে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী সকল শিশুকে এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির মাধ্যমে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী সকল শিশুকে একডোজ কৃমি নাশক ওষুধ সেবন করানো হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার একটি অংশ হচ্ছে ফাইলেরিয়াসিস নির্মূল, কৃমি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কৃমি নির্মূলের লক্ষ্যে ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা কৃমি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী অক্টোবর মাসে দেশে এই কর্মসূচি পালন করা হবে বলে কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা এই তথ্য জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশব্যাপী ক্ষুদে ডাক্তারের মাধ্যমে কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ উদ্‌যাপিত হতে যাচ্ছে।

কৃমির ক্ষতিকর দিক: কৃমির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা বলেন, কৃমি মানুষের পেটে পরজীবী হিসেবে বাস করে এবং খাবারের পুষ্টিটুকু খেয়ে ফেলে, যার দরুন শিশুরাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুষ্টিহীনতায় ভোগে। কৃমি মানুষের অন্ত্র থেকে রক্ত শোষণ করে ফলে শিশুরা রক্ত শূন্যতায় ভোগে। বদহজম, ডায়রিয়া ও শ্বাস কষ্ট সৃষ্টি করে। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির ব্যাঘাত ঘটায় ফলে শিখন ক্ষমতা হ্রাস পায় ও শ্রেণিকক্ষে সক্রিয় থাকতে বাধা সৃষ্টি করে। এপেন্ডিসাইটিস এবং অন্ত্রের অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করে, যার ফলে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। কৃমির অতিশয় সংক্রমণ মৃত্যুর কারণও হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উল্লেখ করেন।
কৃমি নিয়ন্ত্রণ: কৃমি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তারা বলেন, পরিবারের সবাই একত্রে বছরে কমপক্ষে দুইবার (৬ মাস পর পর) কৃমির ওষুধ সেবন করা। খালিপায়ে চলাফেরা না করা এবং পায়খানা ব্যবহারের সময় স্যান্ডেল পরা। পায়খানার পর সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা। হাতের নখ ছোট রাখা আর এজন্য সপ্তাহে একবার নখ কাটা। খাদ্যদ্রব্য ঢেকে রাখা। খোলা বা অপরিচ্ছন্ন খাবার না খাওয়া, ফল-মূল খাওয়ার আগে তা নিরাপদ পানি দ্বারা ধোয়া এবং প্রতিবার খাবার গ্রহণের পূর্বে হাত সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা।
২০১৫-২০১৬ সালের এক জরিপে (শিশুদের মলে কৃমির ওভা বা ডিমের উপস্থিতি) কৃমি সংক্রমণের হার ৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে বলে তুলে ধরা হয়। কিন্তু ২০১৭ সালের বিশেষ জরিপে (আইসিএসপিএম) কৃমি সংক্রমণের হার পাওয়া যায় ১১ ভাগ। সেটা ২০০৫ সালে ৫ থেকে ১৪ বছরের বয়সী শিশুর মধ্যে এই হার ছিল ৩২ শতাংশ। অন্যদিকে ৫৫ বছরের অধিক তাদের মধ্যে এই হার ৪ শতাংশ ছিল। ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণের হার সর্বাধিক বিধায় ১২ বছর বা তার অধিক বয়সী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করতে দেশের সকল মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিল রাউন্ড থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহায়তায় ১২ থেকে ১৬ বয়সী সকল শিশুকে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির মাধ্যমে কৃমিনাশক ওষুধ সেবন করানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র জানান, শিশুদের মাঝে ওষুধ সেবনের হার প্রত্যেক রাউন্ডেই ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ। ২০১৮ সালের ১লা থেকে ৭ই অক্টোবর সময়কালীন কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ ও ক্ষুদে ডাক্তার টিমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, সমাজ সেবা অধিদপ্তর, মাদ্‌রাসা বোর্ড, পৌরসভা, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ, স্কাউট, সাংবাদিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বা সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে একযোগে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
ক্ষুদে ডাক্তার: শিশুর মাধ্যমে শিশুদের স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১১ সাল থেকে দেশের সকল প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রমের শুরু হয়। বিদ্যালয়ের প্রতি শ্রেণি বা সেকশনের জন্য ৩ জন করে ক্ষুদে ডাক্তারের দল গঠনের জন্য ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী বাছাই করে তাদেরকে একজন শ্রেণি শিক্ষকের মাধ্যমে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়। বছরে দুইবার কৃমিনাশক ওষুধ সেবন ও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা (ওজন, উচ্চতা ও দৃষ্টি শক্তির পরিমাপ) করা ক্ষুদে ডাক্তার টিমের অন্যতম প্রধান কাজ, যা একজন গাইড শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্দেশ্যে- শিক্ষার্থীদের উচ্চতা, ওজন পরিমাপ এবং দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা, শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ উচ্চতা, ওজন ও দৃষ্টিশক্তি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং উচ্চতা, ওজন ও দৃষ্টিশক্তির কোনো সমস্যা থাকলে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করা।