৫৫ আসনে ৫শ’ আবেদন

দেশের ৫৫টি সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন চেয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) প্রায় পাঁচশ’ আবেদন জমা পড়েছে। এসব আসনে ইসির প্রস্তাবিত সীমানায় নয়, নিজেদের পছন্দমতো পরিবর্তন চেয়েছেন আবেদনকারীরা। ২৯ আসনের খসড়া সীমানার বিপক্ষে এদের অধিকাংশই আপত্তি জানিয়েছেন। ইসির প্রস্তাবিত সীমানায় তারা নাখোশ।

অপরদিকে বর্তমান কমিশন এখন পর্যন্ত পরিবর্তন করেনি এমন ২৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্যও আবেদন জমা পড়েছে। এর আগে ইসি ৩৮ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া প্রকাশ করে। এর মধ্যে ১৪ আসনের পরিবর্তিত সীমানা বহাল রাখার পক্ষে ১৬৩টি আবেদন জমা পড়েছে। সব মিলিয়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণের পক্ষে-বিপক্ষে ছয় শতাধিক দাবি, আপত্তি ও পরামর্শ জমা পড়েছে।

ইসি সূত্র জানায়, মন্ত্রী, এমপি এবং স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা খসড়ার পক্ষে-বিপক্ষে আবেদনগুলো করেছেন। তবে বেশির ভাগ মন্ত্রী-এমপি সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন চান না। তারা চান সংসদীয় আসনের বর্তমান সীমানা বহাল থাকুক। বর্তমান সীমানাতেই তারা নির্বাচন করার পক্ষে। নির্বাচন কমিশনে পাঠানো আবেদনে তারা এসব বিষয় উল্লেখ করেছেন। ইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, খসড়া সীমানার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আবেদন জমা পড়েছে। তবে পছন্দের সীমানার জন্য কেউ কমিশনের ওপর চাপ দিচ্ছে কিনা- এমনটি আমার জানা নেই। নির্বাচন কমিশন এসব আবেদনের ওপর শুনানি করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে। কারও কোনো বক্তব্য থাকলে শুনানিতে তা উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।

সূত্র জানায়, ৩৮টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনে ১৪ মার্চ ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া প্রকাশ করে ইসি। খসড়ার ওপর আপত্তি, সুপারিশ জমা দেয়ার জন্য ১ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে কমবেশি ৬৫০টি আবেদন জমা পড়েছে। এতে প্রকাশিত খসড়া সীমানার বিপক্ষে ৪৮৭টি ও পক্ষে ১৬৩টি আবেদন জমা হয়। ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যেসব আসনের সীমানায় পরিবর্তন এসেছে সেখানকার বেশির ভাগ বর্তমান ও সাবেক এমপি এ পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন। তারা বর্তমান সীমানা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ইসিতে তদবিরও করছেন। অপরদিকে কোনো কোনো আসনের এমপি সীমানা পরিবর্তনের জন্য সন্তোষ প্রকাশ করে ইসিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, আবেদনকারীদের বড় অংশ আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের অনুসারী। নিজ নিজ প্রার্থীর জন্য সুবিধা হয় এমন সীমানা পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা। এ তালিকায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিএনপির সিনিয়র নেতারাও রয়েছেন। এর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন তার সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনায় ইসিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সীমানায় পরিবর্তন আনায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তবে কমিশন জনসংখ্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক অখণ্ডতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে যত কম সম্ভব আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনার পক্ষে। সেভাবে সামগ্রিক প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।

ইসির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন যে ৩৮টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনে খসড়া প্রকাশ করেছে; তার মধ্যে ২৯টির সীমানা নিয়ে আপত্তি এসেছে। এর মধ্যে ৫টি আসন আছে এগুলোর পক্ষে ও বিপক্ষে আবেদন এসেছে। আসনগুলো হচ্ছে- রংপুর-১ ও ৩, নীলফামারী-৩, কুড়িগ্রাম-৪, পাবনা-১ ও ২, মাগুরা-১ ও ২, খুলনা-৪, সাতক্ষীরা-৪, জামালপুর-৪, ঢাকা-২, ৩, ৭, ১৪ ও ১৯, নারায়ণগঞ্জ-৩, ৪ ও ৫, শরীয়তপুর-২ ও ৩, মৌলভীবাজার-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬, কুমিল্লা-১, ৬ ও ১০, নোয়াখালী-৪ ও ৫ এবং চট্টগ্রাম-৭।

অপরদিকে ১৪টি আসনে পরিবর্তনের পক্ষে আবেদন জমা পড়েছে। এতে খসড়া সীমানা বহাল রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। আসনগুলো হচ্ছে- পাবনা-১, কুড়িগ্রাম-৩ ও ৪, সাতক্ষীরা-৪, জামালপুর-৪ ও ৫, ঢাকা-৩ ও ১৯, শরীয়তপুর-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ ও ৬ এবং কুমিল্লা-১, ২ ও ১০।

জানা গেছে, ইসি এবার ২৬টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করেনি। কিন্তু মাঠ পর্যায় থেকে আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। আসনগুলো হচ্ছে- চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, সিরাজগঞ্জ-১ ও ২, যশোর-৪, নড়াইল-১ ও ২, সাতক্ষীরা-২, বরগুনা-১, পিরোজপুর-১, ২ ও ৩, মানিকগঞ্জ-২, ঢাকা-১৮, গাজীপুর-২ ও ৩, নারায়ণগঞ্জ-২, ফরিদপুর-২, ৩ ও ৪, সিলেট-২ ও ৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, নোয়াখালী-১, লক্ষ্মীপুর-২ এবং চট্টগ্রাম-১৪।

জানা গেছে, আবেদনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৩ আসনের এমপি নসরুল হামিদ, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম রেজা ও একে ফজলুল হক এবং সাতক্ষীরা-৩ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আ ফ ম রুহুল হক, কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দীন নিজ নিজ আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবে আপত্তি দিয়েছেন। তারা চান এখন যেভাবে আছে, সেভাবে থাকুক।

এছাড়া চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য ড. হাছান মাহমুদ, ঢাকা-২ আসনের এমপি খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, মাগুরা-২ আসনের এমপি ড. বীরেন শিকদার ও ঢাকা-১৪ আসনের এমপি সাবিনা আক্তার তুহিন খসড়া সীমানা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

নোয়াখালী-৫ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি নোয়াখালী-৫ থেকে অশ্বদিয়া ও নিয়াজপুর ইউনিয়ন দুটিকে কর্তন না করে ২০১৪ সালে আগের সীমানা অপরিবর্তিত রাখার আবেদন করেছেন। যশোর-৪ আসনের সীমানায় পরিবর্তন না আনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বাঘারপাড়া উপজেলার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. আকমল হোসেন। বিগত কমিশনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের তীব্র সমালোচনা ও ভোটার সংখ্যার বৈষম্য, যাতায়াত ব্যবস্থার সমস্যা তুলে ধরে ৯ম জাতীয় সংসদের সীমানা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সীমানা পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছেন সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী মুজাহিদুর রহমান হেলো সরকার। এতে তিনি ভৌগোলিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার স্বার্থে দুপ্তরা ও সাতগ্রাম ইউনিয়নকে রূপগঞ্জের সঙ্গে সংযুক্ত করে সোনারগাঁ উপজেলা থেকে বারদী ও নোয়াগাঁও ইউনিয়নকে কেটে আড়াইহাজার উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি আসনে বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সীমানার পক্ষে ও বিপক্ষে অর্ধশত আবেদন জমা পড়েছে। একই পরিস্থিতি পাবনা-১ ও ২, ঢাকা-২, ৩ ও ১৯, সিলেট-২ ও ৩ এবং যশোর-৪ আসন ঘিরে। এসব আসনে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে।