৭০ আসনে ধানের শীষ চান নারীরা

নবম সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপি থেকে ১৩ আসনে ১১ জন নারী সরাসরি নির্বাচন করেছিলেন। এবার দলের আরও বেশি সংখ্যক নারীনেত্রী নামতে চাইছেন ভোটের লড়াইয়ে। সারা দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসনেই ধানের শীষের প্রার্থী হতে চান নারীরা। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ সাবেক ছাত্রদল ও মহিলা দলের নেত্রী, সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। আগ্রহীদের মধ্যে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের স্ত্রী, কন্যাদের সংখ্যাও কম নয়।

মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বলছেন, ভোটে লড়ার যোগ্যতা তাদের আছে। দলের বিপদে মাঠে ছিলেন। নেতাকর্মীদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। যে কারণে তারা এবার মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। তবে কেউ কেউ ভবিষ্যতের নির্বাচনের কথা ভেবে এবার মনোনয়ন চেয়েছেন।

২০২০ সালের মধ্যে দলের সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব পূরণের প্রতিশ্রুতি আছে রাজনৈতিক দলগুলোর। নইলে নিবন্ধন ঝুঁকিতে পড়বে। তবে সেই কোটা এখনো পূরণ হয়নি। আর নারী মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মনে করছেন, তাদের প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে বিএনপি এই শর্ত পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রতিবারই একাধিক আসনে নির্বাচিত হয়েছেন। দুর্নীতির দুই মামলায় তিনি কারাগারে থাকলেও তার পক্ষে বগুড়া-৬ ও ৭ এবং ফেনী-১ আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

২০০৮ সালে বরিশাল-৩ আসন থেকে নির্বাচন করে হেরে যান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান। সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবারও এই আসন থেকে মনোনয়ন চান।

ঢাকা-৯ আসনে ধানের শীষ চাইছেন দলের স্বনির্ভর সম্পাদক ও নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেত্রী শিরিন সুলতানা।
ঢাকা-১৩ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হেলেন জেরিন খান। ২০০৮ সালে তিনি মাদারীপুর-২ আসনে ধানের শীষ নিয়ে ভোটে লড়েছিলেন।

হেলেন জেরিন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেক নেত্রী আছেন, যারা পুরুষ নেতাদের থেকেও যোগ্যতাসম্পন্ন। আশা করি, মনোনয়ন পেলে ভালো করব। আমি ৩২ বছর ধরে টানা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দলের বিপদে লুকিয়ে থাকি নাই কখনো।’
বান্দরবান থেকে মা ম্যা চিং দলীয় মনোনয়ন চান। সংস্কারপন্থী থেকে দলে ফেরা ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ঝালকাঠি-২ আসনে লড়তে চান। তিনি ওই আসনে জিতেছেন দুবার।

জামালপুর-১ আসনে শাহিদা আক্তার রিতা ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। এবারও তিনি মনোনয়নপ্রত্যাশী। প্রয়াত নাসিরউদ্দীন আহমেদ পিন্টুর বোন ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সহসভাপতি ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টি মনোনয়ন চেয়েছেন ঢাকা-১৪ আসন থেকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক রুমিন ফারহানা, নীলফামারী-৪ আসনে কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে কনক চাঁপা ধানের শীষ প্রতীকে লড়তে চান।

নাটোর-১ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মনোনয়ন চেয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া।

সিলেট-১ আসনে নুরুন্নাহার বেগম, সিলেট-৬ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য হাদিয়া চৌধুরী মুন্নী চেয়েছেন মনোনয়ন।
মৌলভীবাজার-৩ আসনে মনোনয়ন চান সাবেক সংসদ সদস্য খালেদা রব্বানী, বরিশাল-৪ ও ৫ আসনে চেয়েছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন।

বিলকিস জাহান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে নারীরা সক্রিয় হয়েছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। আমরা আশা করি, সবকিছু বিবেচনা করে আমরা যারা তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের মনোনয়ন দেবে।’

বরিশাল সদর আসনে ছাত্রদলের নেত্রী আফরোজা খানম নাসরিন, ঝালকাঠি-১ আসনে মমতাজ বেগম, ময়মনসিংহ-১১ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য নূরজাহান ইয়াছমিন, চট্টগ্রাম-১০ আসনে নগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি, চট্টগ্রাম-২ আসনে মহিলা দলের সাবেক সভানেত্রী নুরে আরা সাফা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর জেসমিনা খানম, চট্টগ্রাম-৬ আসনে ফরিদা আকতার, চট্টগ্রাম-৯ আসনে বেগম ফাতেমা বাদশা ও চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জান্নাতুল নাঈম চৌধুরী রিকু চেয়েছেন মনোনয়ন।
নেত্রকোনা-২ আসনে আরিফা জেসমিন নাহিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে মিনারা বেগম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে নায়লা আক্তার ও মুসেনা আক্তার, নীলফামারী-৪ আসনে বিলকিস ইসলাম, নেত্রকোনা-৫ আসনে বেগম রাবেয়া আলী, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে সিমকী ইমাম খান, ফেনী-২ আসনে সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু, ফেনী-৩ আসনে শাহানা আক্তার শানু চেয়েছে মনোনয়ন।

বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আয়েশা সিদ্দিকা মানী, চাঁদপুর-৪ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা, ময়মনসিংহ-৩ আসনে ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী তানজীন চৌধুরী লিলি, কিশোরগঞ্জ-১ আসনে সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হোসনে আরা গিয়াস, জামালপুর-৫ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, হবিগঞ্জ-৪ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার, কুষ্টিয়া-২ আসনে ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়া-৪ আসনে ফরিদা মনি, রাজশাহী-৫ আসনে মাহবুবা হাবিবা, ঝালকাঠি-২ আসনে জেবা আহমেদ খান চাইছেন ধানের শীষ।

ফরিদপুর-৪ আসনে শাহরিয়া ইসলাম শায়লা, গাজীপুর-৩ আসনে ফরিদা ইয়াসমিন স্বপ্না, বাগেরহাট-১ আসনে রুনা গাজী, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম হোসেনের মেয়ে মমতাজ হোসেন লিপি, ময়মনসিংহ-৪ আসনে মহিলা দলের নেত্রী মির্জা ফারজানা রহমান হোসনা, শরীয়তপুর-৩ আসনে জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী আল আসমাউল হোসনা, পাবনা-৩ আসনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক আরিফা সুলতানা রুমা, পাবনা-১ আসনে খায়রুন নাহার খানম মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।
সেলিমা রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘মনোনয়ন পেলে জয়ী হতে পারব বলে আশা রাখি। আর দলও নারী প্রার্র্থীদের মূল্যায়ন করবে, এই প্রত্যাশাও সবার। কারণ, এখন নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আন্দোলন-সংগ্রামে নারী সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, এটা অস্বীকার করা যাবে না। মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাদের মূল্যায়ন করা হবে।’

আছেন ১৯ নেতার স্ত্রী

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়ার স্ত্রী শাহিদা রফিক ঢাকা-১৬ আসনে মনোনয়ন চেয়েছেন। সিলেট-২ থেকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা লড়তে চান। তবে তার বড় ছেলে আবরার ইলিয়াসও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সহধর্মিণী ফরহাত কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম-৭ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।

নেত্রকোনা-৪ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামান।

কক্সবাজার-১ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতের আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেলেও সালাহউদ্দিনের দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছেন হাসিনা আহমেদ।

ঢাকা-৯ আসন থেকে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাসও মনোনয়ন চান। ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা প্রয়াত নাসিরউদ্দীন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

নওগাঁ-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছেন প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকীর স্ত্রী নাসরিন আরা সিদ্দিকী। পঞ্চগড়-২ আসনে প্রয়াত সংসদ সদস্য মোজাহার হোসেনের স্ত্রী নাদিরা আখতার, নাটোর-১ আসনে সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের স্ত্রী কামরুন্নাহার শিরীন ও চাঁদপুর-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবি।

নোয়াখালী-৩ আসনে মনোনয়ন চেয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলুর স্ত্রী শামীমা বরকত লাকী। সিরাজগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী রুমানা মাহমুদ ২০০৮ সালে সরাসরি ভোটে জিতেছিলেন। এবারও তিনি প্রার্থী হতে চাইছেন।

নাটোর-২ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সহধর্মিণী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি, যশোর-৪ আসনে টি এস আইয়ুবের স্ত্রী তানিয়া রহমান সুমী, যশোর-৫ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আফসার আহমেদ সিদ্দিকীর স্ত্রী জাহানারা বেগম মনোনয়ন চাইছেন।

টাঙ্গাইল-৪ আসনে কাজী সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ ও শরীয়তপুর-৩ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য হেমায়েত উল্যাহ আওরঙ্গজেবের স্ত্রী তাহমিনা আওরঙ্গ চেয়েছেন ধানের শীষ।

আছেন নেতাদের মেয়েও

মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি আফরোজা খান রিতা মানিকগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচন করতে চান। তিনি সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ মুন্নুর মেয়ে। ফরিদপুর-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়তে চান দলের প্রয়াত মহাসচিব ওবায়দুর রহমানের মেয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ।

চট্টগ্রাম-৫ আসনে মনোনয়ন ফরম কেনা শাকিলা ফারজানা ওই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে। এ ছাড়া ঢাকা-৩ আসন থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায়ের মেয়ে অপর্ণা রায়, একই আসন থেকে গয়েশ্বরের পুত্রবধূ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই চন্দ্র রায় চৌধুরীর মেয়ে নিপুণ রায়, ঢাকা-১ থেকে ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের মেয়ে মেহনাজ মান্নান ও সাবেক নেতা নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিমা হুদা চেয়েছেন বিএনপির মনোনয়ন।