16 জানুয়ারি 2017

ডুমুরিয়ায় ভূমিহীন পরিবার উচ্ছেদে মধ্যযুগীয় তান্ডব

150527-Land lessখুলনানিউজ.কম:: ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের ভদ্রা নদীর ভরাটি জমির একটি অংশে বসবাসরত ১০টি ভমিহীন পরিবারকে উচ্ছেদের জন্য তাদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অসহায় ভূমিহান পরিবারগুলো সর্বস্ব হারিয়ে এখন  খোলা আকাশের নীচে নারী ও শিশুদের নিয়ে বসবাস করেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ভ’মিহীন পরিবারকে জেলা প্রশাসেকের পক্ষ থেকে সহায়তা করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। ঘটনার সাথে যুক্ত ইউপি মেম্বর শাহিনুজ্জামানকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার সকাল সাতটার দিকে শিমূল বিশ্বাস,শাহিন মেম্বর ও  হাবিবুর রহমান বিশ্বাস ওরফে বোমা হাবিব ৪০/৫০ জন নিয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের ভরাট হওয়া ভদ্রার ট্রলার ঘাট এলাকায় বসবাসরত ভূমিহীনদের উপর হামলে পড়ে। এ সময়ে তারা ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙ্চুর চালালেও পুলিশকে খবর দেয়ার পরও পুলিশ ঘটনাস্থলে আসেনি।

ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের ট্রলার ঘাটের আশপাশসহ ভদ্রা নদীর ভরাটি অংশে প্রায় ৩ শতাধিক পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে ট্রলার ঘাটের সন্নিকটে এবং থানা থেকে ২০০ গজ দুরে ১০টি পরিবারের প্রায় ১৫টি ঘর বসতঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। ১০টি ভূমিহীন পরিবারে নারী ও শিশুসহ প্রায় ৪০জন  বসবাস করে। তাদেরকে উচ্ছেদে প্রায় ৪০/৫০ জন যুবক রড, কাটা পাইপ, রামদা, হাতুড়ি, কুড়াল, লাঠিসোটা নিয়ে ভুমিহীন পরিবারের উপর হামলা চালায়। তাদেও হামলা ভাঙচুরের সময়ে নারী-পুরুষসহ কমপক্ষে আহত হন ১০/১৫জন। সকাল সাতটা থেকে বেলা ১০টা পর্যন্ত তিনঘন্টা যাবত সেখানে হামলাকারীরা তান্ডব চালায়।  কিন্তু ঘটনার সময়ে সাদা পোষাকে পুলিশের সদস্যরা দাড়িয়ে থাকলেও তাদের সহযোগিতা করতে সেসব পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসেনি।

নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ভূমিহীনদের উপর হামলা তান্ডব চালানোর পর ঘন্টা দুয়েক পর বাজারের কসাইখানার টিউবওয়েলের পাশে দাড়িয়ে থানার দারোগা নজরুল ইসলাম হামলাকারীদের সাথে কথা বলছিল। ওই সূত্র জানায়, এ সময়ে শিমূল বিশ্বাস, শাহিন সরদার, হাবিবুর বিশ্বাস ওরফে বোমা হাবিব , বকুল বিশ্বাসের সাথে ওই দারোগা কথা বলছিল। তারা আরও জানান, দারোগা নজরুল এ সময়ে সাদা পোষাকে একটি কালো রঙের মোটর সাইকেল চড়ে আসে। তিনি রউফ হালদারের মিলের সামনের রাস্তা দিয়ে পরে  ঘটনা স্থল ত্যাগ করে চলে যান। তারা জানান, হামলাকারীরা আগে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। সাম্প্রতিককালে তারা আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাদের সাথে চলাফেরা করেন।


সলিম হাওলাদারের স্ত্রী শাবানা বেগম বলেন, আমার শিশু সন্তান সকালে রান্নাঘরে খেতে বসেছিল। হঠাৎ করে হাবিসহ আরও ৪/৫জন লোক আমার রান্না ঘরে ঢুকে ছেলের সামনে ভাতের থালাটি লাথি মেরে ফেলে দেয়। আমাকে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরে বের করে দেয় তারা। এমন কেন করা হচ্ছে জানতে চাইলে হাবি  বলে লিডারের নির্দেশ জায়গা খালি করতে হবে। ঘর ছেড়ে চলে যা না হলে গুলি করে মারব।

 ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ী আব্দূল হান্নান শেখ (৬৭) বলেন, ২০ বছর আগে জমিতে দখলে থাকা ও জনৈক ইসহাক খানের কাছ থেকে আমি এই জমিটুকু ক্রয় করি। সে সময় থেকে সেখানে ঘর বেঁধে বসবাস করছি। গত ২/৩ মাস আগে এলাকার মজিদ বিশ্বাসের ছেলে শিমূল বিশ্বাস আমিসহ এখানকার বসবাসকারী অন্যান্য ভূমিহীন পরিবারদের  জায়গা ছেড়ে দিতে হুমকি ধমকি দেয়।  আজ (বুধবার) সকালে শিমূল ও হাবি তাদের দলবল নিয়ে আমাদের উপর হামলে পড়ে। আমি সে সময়ে ভাত খেয়ে কাজে বের হচ্ছিলাম। আমাকে তারা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে এবং কাঠের চলা দিয়ে আমার পিঠে আঘাত করতে থাকে। আমি চিৎকার চেচামেচি করতে থাকলেও তারা কাউকে এগিয়ে আসতে দেয়নি। তিনি জানান, এই জমি সরকারী খাস জমি। আমি ভূমিহীন হিসেবে বরাদ্দ পেতে আবেদন করেছি।

মাছ ব্যবসায়ী এবাদুলের স্ত্রী জলি বেগম (৩৫) জানান, সকালে আড়তে মাছ কিনতে যাওয়ার জন্য আমার স্বামী গোছগাছ করছিল এমন সময়ে একদল যুবক আমার ঘরে প্রবেশ করে আমাকে টানতে টানতে ঘর থেকে বের করে আনে। তারা আমার স্বামীকে এলোপাতাড়ি কিলঘুষি মারতে থাকে। তারা ঘরে বাক্সে রাখা ৪০ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। মঙ্গলবার মাছ বিক্রি করে ঘরে ওই টাকা রেখেছিলাম। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে শিমূল বিশ্বাস থানায় মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে থানায় ডেকে নিয়ে যায়। এ সময়ে থানার ওসি সাহেব আমাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে । ওসি সাহেব জমি ছেড়ে দিতেও আমাদেরকে শাসায়।

আমিরুন্নেছা ( ৫৮) বলেন, থানায় ডেকে ওসি সাহেব বলে, জায়গা ছেড়ে দিবি না হলে  সব মাগিরে ধরে হাজতে ঢুকায়ে দেব। তিনি বলেন, আজ যেভাবে আমাদের উপর অত্যাচার করা হয়েছে তা ৭১ সালের গন্ডগোলের  সময়েও দেখিনি।

ভূমিহীন নেত্রী সাবেক মহিলা মেম্বর জাহানারা বেগম বলেন, গত মাসখানেক আগে থেকে ভ’মিহীন পরিবারদেও উচ্ছেদের জন্য বার বার হুমকি ধমকি দিচ্ছে। আমরা বার বার বিষয়টি নিয়ে পুলিশকে জানিয়েছি কিন্তু ওসি সাহেব ভূমিহীনদেরকেই জায়গা ছেড়ে দিতে হুমকি দেয়। জায়গা ছেড়ে না দিলে সবাইকে হাজতে ঢুকিয়ে দেয়ারও হুমকি দেয় ওসি।

এ ব্যাপারে জমির মালিকানা দাবিদার শিমূল বিশ্বাস জানান, জনৈক ফারুকের কাছ থেকে তিনি ৫০ শতক জমি কিনেছেন। সেখানে ১০/১২টি পরিবার ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করে। ওই জমিতে পাকা ঘর নির্মাণের জন্য ভাড়াটিয়াদেও ঘর ছেড়ে দিতে বললেও তারা ঘর ছাড়তে তালবাহানা করতে থাকে। বিষয়টি থানা পুলিশকে জানান হয়েছে। একাধিকবার পুলিশ তাদেরকে ঘর ছেড়ে দিতে বললেও তারা ঘর ছাড়েনি। তাই আজ ঘর থেকে তাদেরকে বের কওে দেয়া হয়েছে।

ডুমুরিয়া ইউনিয়নের মহিলা মেম্বর ও উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক তহমিনা বেগম বলেন, ভুমিহীনদের উপর আজ যে ঘটনা ঘটনানো হল তা পাকিবাহিনীর অত্যাচারকেও হার মানিয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে মোবাইল ফোনে জানানো হয়েছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে ওসির মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে ঘটনার দুই ঘন্টা পর ঘটনাস্থলে আসা উপ-পরিদর্শক লিটন মল্লিক জানান, ওসি স্যার ছুটিতে আছেন।

ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: রফিকুল হাসান বলেন, ভ’মিহীন পরিবারের উপর যে হামলা হয়েছে তা অত্যন্ত অমানবিক। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভুমিহীন পরিববারকে সহায়তা দিতে জেলা প্রশাসক নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা হিসেবে প্রাথমিকভাবে ঢেউটিন ও আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।

ঘটনার পর বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন সহকারী পুলিশ সুপার ফরহাদ খান। তিনি ঘটনার নৃশংসতা দেখে হতবাক হন। এ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন পরিবারের সাথে কথা বলেন। নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত ভুমিহীন সদস্যরা তার কাছে ডুমুরিয়া থানা পুলিশের ভূমিকায় ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেন।  তিনি তাদেরকে যার যার অবস্থানে বসবাস করার কথা বলেন এবং সরকারী নিয়ম অনুযায়ী ভূমিহীন পরিবারকে জমি বরাদ্দ নেয়ার জন্য অনুরোধ জানান। সহকারী পুলিশ সুপার ফরহাদ খান বলেন, যদি কেউ জমির মালিক দাবিদার হন তাহলে আদালতের মাধ্যমে এর নিষ্পত্তি হতে পারে। এভাবে কারও উপর হামলা করা বেআইনী।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ন চন্দ্র চন্দ বলেন, যারা অসহায় ভূমিহীনদেও উপর হামলা চালিয়েছে তারা যে দলের লোক হোক না কেন তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে সকল সুবিধা দেয়া হবে।

এদিকে এ ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের পক্ষ থেকে নজরুল ইসলাম গাজী বাদী হয়ে থানায় একটি অভিযোগ দাখিল করেছে। ওই অভিযোগে ১৪ জনের না উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৩০/৪০জনকে আসামী করা হয়েছে। পুলিশ ইউপি সদস্য ও মামলার প্রধান আসামী শাহিনুজ্জামান সরদারকে আটক করেছে।

// আব্দুল লতিফ মোড়ল, ডুমুরিয়া, খুলনা: ২৭-০৫-২০১৫ //