26 মে 2017

লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ

এইচ এম আলাউদ্দিন:: গরমের সাথে পাল্লা দিয়েই চলছে লোডশেডিং। ফলে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ওয়েষ্ট জোন পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানীর আওতাধীন পদ্মার এপারের একুশ জেলার শহর এলাকার পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রামাঞ্চলেও লোডশেডিং চলছে সমানে।

ভৈরবে মেঘনা নদীর ওপর ঘোড়াশাল-ইশ্বরদি সঞ্চালন লাইনের রিভার ক্রসিং টাওয়ার ভেঙ্গে পড়ার কারণে যেমন জাতীয় গ্রীড থেকে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ আনতে না আনতে পারায় লোডশেডিং হচ্ছে তেমনি জাতীয় গ্রীডে এ অঞ্চল থেকে বিদ্যুৎ নেয়াটাও লোডশেডিংয়ের আর একটি কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া আগামী মাহে রমজানকে সামনে রেখে খুলনার তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চলছে ওভারহোলিং। এর ফলেও চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। আর খুলনার মূল শহরে লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে অফিসিয়ালী বিদ্যুৎ সরবরাহ না করা।

বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বর্তমানে কিছুটা সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। আর ঠিক এমন সময় প্রচন্ড গরমের কারণে বৈদ্যুতিক চাহিদা বেড়ে গেছে। একদিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়া অপরদিকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং রিভার ক্রসিং টাওয়ার ভেঙ্গে যাওয়া এসব নানা কারণে লোডশেডিং চলছে ভয়াবহ আকারে। খুলনা রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট, ভেড়ামারার একটি এবং ভোলার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বর্তমানে ওভারহোলিং চলছে উল্লেখ করে ওজোপাডিকোর একটি সূত্র জানায়, আগামী ২৪ মে থেকে এ তিনটি কেন্দ্র চালু হতে পারে। সুতরাং ২৪ মে’র আগে লোডশেডিং কমার সম্ভাবনা নেই বলেও সূত্রটি উল্লেখ করছে।

অবশ্য শুক্রবার পিক আওয়ারে খুলনায় বিদ্যুৎ দেয়ার পরিবর্তে আন্ত:সংযোগের মাধ্যমে জাতীয় গ্রীডে ২৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেয়া হয় উল্লেখ করে ওজোপাডিকোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সূত্রটি জানায়, এজন্য গতকাল পিক আওয়ারে পদ্মার এপারের একুশ জেলায় ৪৪৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। মোট ১৩৩৮.৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে গতকাল পিক আওয়ারে সরবরাহ হয় ৯০০ মেগাওয়াট।

পদ্মার এপারের ১১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শুক্রবার ৭৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানায়, এর বাইরেও ভারত থেকে আনা হয় ৪৮১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অর্থাৎ ১২২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এ অঞ্চলে সরবরাহের সুযোগ থাকলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কম থাকত। কিন্তু জাতীয় গ্রীডে এ থেকে ৩৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেয়ার ফলে লোডশেডিং বেড়ে যায়।

সূত্রটি বলছে, খুলনা মহানগরীসহ আশ-পাশের এলাকায় চারটি বিতরণ বিভাগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ ও ভিআইপি এলাকা হিসেবে বিবিবি-১কে ধরা হয়। আর এ বিতরণ বিভাগেই চলছে সমন্বয়হীনতা। বিশেষ করে বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১এর আওতাধীন আটটি ফিডারের মোট চাহিদা থাকে ৪০/৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর চাহিদাই থাকে ১০ মেগাওয়াট। ওই ফ্যাক্টরীটি যখন চালু থাকে তখন অন্যান্য ফিডারগুলোতে পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হয়। অথচ ওই সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর জন্য বর্তমানে অফিসিয়ালী কোন বিদ্যুৎ বরাদ্দ নেই। এজন্য সম্প্রতি কেন্দ্রীয় লোড ডেসপাস সেন্টার বা এলডিসিকে পত্র দিয়েছেন ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যথাযথ তদ্বির না করার ফলে সে ব্যাপারেও কোন ত্বড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে অবশ্য বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো: হাবিবুর রহমান বলেন, চাহিদার তুলনায় তিনি অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। বিষয়টি এলডিসিকে পত্র দিয়ে জানানো হলেও ঘোড়াশালের রিভার ক্রসিং টাওয়ার ভেঙ্গে যাওয়ার দোহাই দিয়ে চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে না। যেহেতু বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে সেহেতু সতর্কতা অবলম্বন না করলে আবারও গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়তে পারে। ঘোড়াশাল রিভার ক্রসিং টাওয়ার সংস্কার করতে এখনও তিনমাস সময় লাগবে বলেও সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়। গত ২ মে রাতে কালবৈশাখী ঝড়ে টাওয়ারটি ভেঙ্গে যায়।
খুলনার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১এর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের অপর একটি সূত্র জানায়, আটটি ফিডারের মধ্যে দোলখোলা, নতুনবাজার ও বাগমারা ফিডারকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় লবনচরা উপ-কেন্দ্র থেকে। আবার কাষ্টমঘাট, টুটপাড়া, মুন্সিপাড়া, সার্কিট হাউজ ও হাজী মহসীন ফিডারকে চালু রাখা হয় গল্লামারী জিআইএস(গ্যাস ইনসুলেটেড সাব স্টেশন) থেকে বিদ্যুৎ দিয়ে। সর্বমোট আটটি ফিডারের মধ্যে অধিকাংশ ফিডারই সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হয় বিশেষ বিশেষ কারণে। কেননা বিবিবি-১এর আওতাধীন অনেক এলাকাই ভিআইপি হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। তার পরেও এ বিভাগের প্রতি কর্তৃপক্ষের নজর একেবারেই কম বলেও একাধিক সূত্র দাবি করেছে। বিশেষ করে গতকাল বিবিবি-১এর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে গিয়ে দেখা যায় অনেকটা ঝুকির মধ্য দিয়েই গোটা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দু’টি এয়ার কুলার নষ্ট থাকায় যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমনটিও আশংকা সংশ্লিষ্টদের। আর সেটি হলে বিদ্যুতের আরও ভয়াবহ অবস্থা দেখা দিতে পারে।

ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো: শফিক উদ্দিন বলেন, লোডশেডিংয়ের বিষয়টি সাময়িকের জন্য। এটি বর্তমানে সারাদেশেই হচ্ছে। কেননা, রমজানকে সামনে রেখে বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র ওভারহোলিং হচ্ছে। আগামী ২/৪ দিনের মধ্যেই সেগুলো সংস্কার হয়ে উৎপাদনে যেতে পারে। ফলে আর লোডশেডিং থাকবে না।
খুলনা বিবিবি-১এর একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর জন্য ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ না থাকার বিষয়টি সম্পর্কে ওজোপাডিকো’র এমডি জানান, এটিও সাময়িকের জন্য। লোড পাওয়া গেলে এ সমস্যা থাকবে না।

লোডশেডিংকে অবশ্য কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা বলে দাবি করেন, ওজোপাডিকো সিবিএ নেতৃবৃন্দ। সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক শেখ আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকারই হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়। তিনি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর সে লক্ষ্য বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্থ হলে খুলনার জনগন মেনে নেবে না। জাতীয় গ্রীড, লোড ডেসপাস সেন্টারসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন এমনটিও আশা করেন এই শ্রমিক নেতা।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, লোডশেডিং খুলনাঞ্চলেই বেশি। অথচ রাজধানীতে এত লোডশেডিং নেই। এটি এ অঞ্চলের জন্য বরাবরের মত একটি বৈষম্য। তিনি এ বৈষম্যের অবসান দাবি করেন।

// ২০-০৫-২০১৭ //