23 মার্চ 2017

দক্ষিণডিহি বিশ্বকবির শ্বশুরবাড়িটি এখন রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর

150507-Robiখুলনানিউজ.কম:: খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি। এ বাড়িকে ঘিরে গড়ে উঠেছে - “দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স”। বাড়ির সামনে বিশ্বকবি ও মৃনালিণীর আবক্ষ মূর্তি এবং সেই পুরানো ছবেদা গাছের

তলায় নির্মিত হয়েছে মৃনালিণী মঞ্চ। ২০১৪ সাল থেকে রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং এ বছর ১ এপ্রিল থেকে দেশী-বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য ধার্য করা হয়েছে। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মৃণালিণী দেবির বিয়ে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বেণীমাধব রায়চৌধুরী দেশভাগের বহু আগে থেকে কলকাতায় বসবাস করতেন। তাঁর ছেলে নগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী ওরফে ফেলুবাবু জমিদারী দেখার জন্য মাঝেমধ্যে দক্ষিণডিহিতে আসতেন। ফেলুবাবুর ছেলেরা তখন কেউ দক্ষিণডিহি আবার কেউ কলকাতায় বসবাস করতেন।

১৯৪০ সালে এ পরিবারের সবাই দেশত্যাগ করেন। এর আগে ফেলুবাবু ও তাঁর স্ত্রী বাড়িসহ আশপাশের ৭ দশমিক ৮ একর জমি বাদে সমুদয় সম্পত্তি দক্ষিণডিহির আরেক জমিদার বিজনকৃষ্ণ দাসকে বন্দোবস্ত দেন।

বাড়ি ও সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয় নায়েব নবকুমার মুস্তাফিকে। ১৯৬৫ সালে বিজনকৃষ্ণ দাস দেশত্যাগ করেন। পরে নায়েব নবকুমার মুস্তাফীর আর কোন খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় বেদখল হয়ে যায় বাড়িটি। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে বাড়িটি উদ্ধার করা হয়। অবৈধ দখল থেকে উদ্ধারের পর ওই বছর এখানে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় রবীন্দ্র কমপ্লেক্সের। প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স-রবীন্দ্র চর্চার এক বহুমুখী কেন্দ্র। 

তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হককে আহবায়ক করে একটি কমিটি গঠিত হয়। এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছিল তৎকালিন খুলনার ফুলতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা সুলতানা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অমিতাভ সরকার, কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক,  সাংবাদিক বিধান দাসগুপ্ত, প্রফেসর অচিন্ত কুমার ভৌমিক, শিক্ষক দেবরঞ্জন  সহ স্থানীয় রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষ। এরপর থেকে জেলা প্রশাসক, প্রশাসনের কর্মকর্তা, খুলনা ও ফুলতলার সুধীজন, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে মতবিনিময় সভায় ঐ বাড়িটি ঘিরে কি করা যায় তা আলোচনা করা হয়।

বাড়িটির সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য সরকারী পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। সিদ্ধান্ত হয় সাহিত্য চর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে সাধারণ মানুষের উপযোগী করে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার। কমপ্লেক্স ভবন প্রতিষ্ঠার পর হতে পর্যটন পল্লী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। রবীন্দ্র সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ভবন, দ্বিতল ভবনের সামনে স্থাপন করা হয়েছে বিশ্বকবি ও মৃনালিণীর আবক্ষ মূর্তি এবং সেই পুরানো ছবেদা গাছের তলায় নির্মিত হয়েছে মৃনালিণী মঞ্চ।

তবে কমপ্লেক্সের পূর্ণরুপ দেয়া প্রয়োজন। ২০০৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন ভবনটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে। ২০১০ সালের ২৭ জুলাই ৪০ শতক জমিও বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ২০১০-১১ এবং ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সাড়ে ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটির সংস্কার-সংরক্ষণ করে। যদিও সংস্কারের নামে কালের স্বাক্ষী এই ভবনটির মৌলিকত্ব ও প্রতœতাত্ত্বিক সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং এ বছর ১ এপ্রিল থেকে দেশী-বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য ধার্য করা হয়েছে।

দক্ষিণডিহি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করায় প্রতি বছর ২৫ বৈশাখ থেকে ৩দিন ব্যাপী রবীন্দ্র জয়ন্তী ও লোকমেলা অনুষ্ঠিত হয়।  ৩দিন ব্যাপী এ লোকমেলাকে ঘিরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকমেলা, আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

দেশ বিদেশের হাজার হাজার ভক্তবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। তবে ২২ শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু বার্ষিকী, ৯ ডিসেম্বর রবীন্দ্র-মৃনালিণীর বিবাহ বার্ষিকী পালন করা প্রয়োজন বলে রবীন্দ্র ভক্তদের প্রাণের দাবি।  

// তাপস কুমার বিশ্বাস: ০৭-০৫-২০১৫ //