26 জুন 2017

মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে গাংনীর অর্ধশতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ

150516-gangni dankola up nikosখুলনানিউজ.কম:: মেহেরপুরের গাংনীতে মানবপাচারের ঘটনা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে গত দু বছরে গাংনী উপজেলায় অন্তত অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিরা জীবিত রয়েছে নাকি মারা গেছে নিশ্চিত করতে পারেনী পরিবার গুলো।

নিখোঁজ পরিবার গুলোতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আনতে অবৈধ ভাবে মালেশিয়া যাওয়ার পথে কাউকে সাগরে ফেলা হয়েছে অথবা টাকা না পেয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ভাবে চলছে পানি পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার করুন চিত্র। তবুও থেমে নেই মানবপাচার। মানবপাচারকারীদের গ্রেফতার ও প্রশাসন তৎপর হলে মানবপাচার কিছু হলেও কমে আসবে বলে ধারণা করছে স্থানীয়রা। অভাব অনটন আর এনজিওর লোন পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পরিবার গুলো। সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে নিখোঁজ স্বজনদের অফেক্ষায় রয়েছে পরিবার গুলো।

গাংনী উপজেলার অন্তত ১৫ জন মানবপাচারের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত থাকলেও এ পর্যন্ত কোন মানবপাচারকারীদের তালিকা নেই স্থানীয় প্রশাসনের কাছে।

গাংনী উপজেলার বানিয়াপুকুর, খড়মপুর, হেমায়েতপুর, চাঁদপুর, রুয়েরকান্দি, পাকুড়িয়া, কসবা, সানঘাট, বড় বামুন্দী, কড়ুইগাছী ও বাঁশবাড়িয়া, হাপানিয়া সহ উপজেলার অন্তত ৬০ গ্রামে মানবপাচারকারীরা সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় দালালরা লোভনীয় চাকুরীর অফার দিয়ে বেকার যুবক ও দরিদ্র শ্রেণীর মানুষদের সহজেই মালেশিয়া যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এমন কি জীবনও দিতে হচ্ছে মালয়েশিয়া গামী বেকার যুবকদের।

নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন, ধানখোলা গ্রামের মজিদ আলীর ছেলে অজিত আলী,আড়পাড়ার বারী মোল্লার ছেলে মিনারুল ইসলাম, খড়মপুরের কাজিম আলীর ছেলে লালন মিয়া,সাহাদত আলীর ছেলে আসান আলী, পিজের মন্ডলের ছেলে জাকিরুল ইসলাম, রমজান মন্ডলের ছেলে ওয়াসিম আলী, কসবার খেদ আলী মন্ডলের ছেলে জিয়া, পাকুড়িয়ার উসমান আলীর ছেলে রুস্তুুম আলী, বানিয়াপুকুর গ্রামের রইচ উদ্দীনের ছেলে আসাদুল ইসলাম, হারুন মন্ডলের ছেলে মিনারুল ইসলাম, জমির উদ্দীনের ছেলে জাহিদুল ইসলাম, হাফেজ উদ্দীনের ছেলে জিন্নাত আলী, মহিবুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলাম, রুয়েরকান্দি গ্রামের, জুলামিন মিয়ার ছেলে রিফা, আইযুব আলীর ছেলে বাবলু, ইয়াসিন আলীর ছেলে গঞ্জের, ফাকের আলীর ছেলে আহাদ আলী, কড়–ইগাছী গ্রামের ইদ্রীন আলীর ছেলে আমজাদ হোসেন, মোনাজাত আলীর ছেলে হাবিবুর রহমান,বড় বামুন্দীর জাহা বকসের মহাবুল, মুনছুর আলীর ছেলে আনারুল ইসলাম, বাঁশবাড়িয়া গ্রামের আসমত আলীর ছেলে আক্তারুল ইসলাম, হাপনিয়া গ্রামের নজির মন্ডলের ছেলে আবুল কালাম প্রমুখ।  এছাড়া গত ১০ অক্টোবর তেরাইল গ্রামের মামুন নামের এক যুবক কে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সাগরে ফেলে হত্যা করে মানব পাচারকারীরা।

একই গ্রামের অন্য তিনজন বেল্টু,আজিরুদ্দীন ও হাফিজুল ইসলাম কে জিম্মি করে মুক্তিপন দাবি করেছিল দালাল চক্র। ইতো মধ্যে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে বেল্টুর পিতা বিকাশের মাধ্যমে ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছে দালাল চক্র কে।

মামুনের বড় বোন নাছরিন জানান,উপজেলার হেমায়েতপুর গ্রামের জাহিদ হোসেন ও তেরাইল গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন তার ভাই মামুন কে নানা প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ট্রলারে তুলেছে। মুত্যুর আগে মামুন মোবাইল ফোনে পরিবারের সদস্যদের বলেছে আমি মালয়েশিয়া পৌছানোর পর জাহিদ ও জাহাঙ্গীর কে ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দিও।

খড়মপুর গ্রামের নিখোঁজ জাকিরুল ইসলামের পিতা পিজের মন্ডল জানান,একই গ্রামের আহমেদ আলী দালালের মাধ্যমে তার ছেলে মালেশিয়া যাচ্ছিল। কিন্তু গত ২ বছর যাবৎ জাকিরুল ইসলাম নিখোঁজ রয়েছে।

কসবা গ্রামের জিয়াউর রহমানের চাচা আরিফুল ইসলাম জানান, খড়মপুর গ্রামে আদম ব্যবসায়ী আহমেদ আলী তার চাচা কে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ট্রলারে করে নিয়ে গেছে। পরে তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নী। জিয়াউর রহমানের সন্ধান দেয়া হবে এজন্য বিপুল পরিমান টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন দালাল আহমেদ আলী।

বানিয়াপুকুর গ্রামের নিখোঁজ  জিন্নাতের ভাই সাহারুল ইসলাম জানান,ঝোড়পাড়া গ্রামের আদম ব্যবসায়ী বজলু তার ভাই কে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা বলে নিয়ে গেছে। গত ১ বছরের বেশি সময় ধরে তার কোন সন্ধান মেলেনী।

নিখোঁজ স্বজনদের অভিযোগ খড়মপুরের মানবপাচারকারী আহমেদ আলী,হেমায়েতপুরের জাহিদ হোসেন,বাখাল,আবুল কাশেম,ঝোড়পাড়ার বজলু ও কালু সহ অন্তত ১৫ জন দালাল মালোশিয়া পাঠানোর কাজে সক্রিয় রয়েছে। তবে আদম ব্যবসায়ীদের সাথে কোন ভাবেই যোগাযোগ করে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নী।

মেহেরপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদ হোসেন জানান,সুনিদৃষ্ট ভাবে মানবপাচারের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নী। অভিযোগ পেলে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার হামিদুল আলম জানান,মানব পাচারের অভিযোগ কেউ করেনী। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া মানবপাচার রোধে পুলিশ সর্তক রয়েছে।

গাংনী থানার ওসি তদন্ত মোক্তার আলী জানান,তিনি এ পর্যন্ত ১৮ জন ইরাকে যাওয়া সংক্রান্ত বিষয় তদন্ত করেছেন। কিন্তুু মালোশিয়ায় মানবপাচার সংক্রান্ত কোন অভিযোগ তাদের কাছে নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ধানখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক জানান, তার ইউনিয়নে অন্তত ১০/১২ জন নিখোঁজ রয়েছে। যে কোন ভাবে নিখোঁজদের সন্ধান করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তিনি।

// ফারুক আহমেদ, মেহেরপুর: ১৫-০৫-২০১৫ //