28 ফেব্রুয়ারি 2017

রবীন্দ্রনাথের আদি ভূমি পিঠাভোগ ২১ বছর পর সরকারী স্বীকৃতিলাভ

150507-Robindro nath Pithavogeঅরুন শীল:: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদি পূরুষের জন্মভুমিতে ১৯৯৪ সালের ২৪শে নভেম্বর (খুলনা জেলার রুপসা উপজেলার পিঠাভোগে) রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। দীর্ঘ ২১ বছর পর কবিগুরুর পূর্বপুরুষের নিবাসভুমি সরকারীভাবে গেজেটে

অন্তভুক্ত হতে চলেছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (১৫ বৈশাখ-১৪২২) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের শাখা-৬ থেকে  সিনিয়র সহকারী সচিব ছানিয়া আক্তার স্বাক্ষরিত পত্র স্মারক নং- ৯৫৮ তারিখ:১৫ মার্চ-২০১৫তারিখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষের বসতভিটা প্রতœতাত্বিক গুরুত্ব থাকায় ১৯৬৮ সালের প্রত্নতত্ব সংক্ষেন আইন(১৯৭৬ সালে সংশোধিত) অনুয়ায়ী পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষনযোগ্য বিবেচিত হওয়ায়, সরকার উল্লিখিত বসতভিটা সংরক্ষনের সিধান্ত গ্রহন করেছেন। এ লক্ষ্যে পুরাকীর্তিটি সংরক্ষন বিজ্ঞপ্তি ও পরবর্তী গেজেটে তা প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ঐ পত্রে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা সাহিত্যাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে সু-প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি আমাদের আনন্দ আর গর্বের অনন্ত অনুভূতি। সাহিত্যের এ ধ্রুবতারার আদিপুরুষ ও আদি আত্মীয়তা সবকিছু ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের যশোর-খুলনা অঞ্চলে। রবীন্দ্রনাথ জীবনকে দেখেছিলেন সাহিত্য চেতনার মধ্য দিয়ে।

এই চেতনাকে ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানবিক। একারনেই বৈশ্বিক পরিমন্ডলে মানবতার মুক্তির দর্শন আর এক রবীন্দ্রনাথকে আমরা খুজেঁ পায় বাঙ্গালীর চিত্তে। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় বিরচিত রবীন্দ্র জীবনী গ্রন্থের প্রথম খন্ড আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের কাহিনী।

বহু রবীন্দ্র গবেষক রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের পীরালি ব্রাম্মন বলে অভিহিত করেছেন। এসকল বিষয়ে আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা জানতে আগ্রহী। সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের আদি নিবাস ভূমি খুলনা জেলার রুপসা উপজেলার নিভৃতপল্লী পিঠাভোগ ঘুরে সরজেমিনে এ তৈরী করা হয়েছে প্রতিবেদনটি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি তথা বাঙালি জাতিকে বিশ্বের কাছে উন্নীত করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বস্তুত বাঙালি জাতিসত্তার প্রাণপুরুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর বহুধা বিস্তৃত স্ব-প্রতিভায়।

স্বাভাবিক কবি রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি ব্যক্তি মানুষ রবীন্দ্রনাথকে সহজ সত্যে ধারণ করতে হয়েছে তাঁর পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারকে। এই বংশজাত উত্তরাধিকারের ঐতিহাসিক ধারায় অবিচ্ছেদ্যভাবে, ভৌগোলিক সীমার আবর্তে তিনি আবর্তিত না হয়েও, ভৌগলিক অবস্থানের ঐতিহাসিক পরিচয়কে অস্বীকার করতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ।

আর সংগত কারণেই কবি রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাসভূমি, শশুরবাড়ি, মামাবাড়ি এবং জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত করেছেন খুলনা অঞ্চলে।

আদি পুরুষের বাড়ি : পিঠাভোগ-প্রাচীন যশোর জেলার বর্তমান খুলনা জেলার রুপসা উপজেলার একটি সুপরিচিত গ্রাম। সবুজ শ্যামলিমায় ভরা এ গ্রাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদিপুরুষের বাড়ি এই পিঠাভোগ গ্রামে।

এখানকার কুশারী পরিবার কবির আদিপুরুষ। ১৯৯৪ সালে রবীন্দ্রনাথের আদিপুরুষের একটি কারুকার্যময় সুর্দৃশ্য দ্বিতল ভবন খুলনার জনৈক ব্যবসায়ী ২ লক্ষ ২৪ হাজার টাকায় ক্রয় করে ভেঙ্গে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, যশোর বৃটিশ ভারতের প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসী জেলা। ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন যশোর জেলা সৃষ্টি হয়। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে খুলনা যশোর জেলার মহকুমা এবং ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে যশোর জেলা থেকে খুলনা পৃথক জেলায় রুপান্তরিত হয়।

১৯৯৪ সালে পিঠাভোগ গ্রামের বাসিন্দা ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক এবং অধুনালুপ্ত জাতীয় দৈনিক আজকের কাগজ ও খুলনা থেকে প্রকাশিত আঞ্চলিক দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার তৎকালীন কর্মরত সাংবাদিক অরুন শীল (বর্তমানে মাগুরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক খেদমতের বার্তা সম্পাদক) কবির আদি পুরুষের বাড়ী শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাক এবং আজকের কাগজ পত্রিকায় ভিন্ন দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

প্রতিবেদনদ্বয় প্রকাশিত হওয়ার পরই বিষয়টি সকলের নজরে আসে। সংবাদটি প্রকাশের পর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে সে সময় খুলনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হক রবীঠাকুরের আদি নিবাসভুমি সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহন করেন।

জেলা প্রশাসকের উদ্যোগ গ্রহনের সময়কালেই আদি নিবাস পিঠাভোগের সেই বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। বাড়ি বিক্রির পর সরকারিভাবে অবশিষ্ট অংশ সংরক্ষণ করে ১৯৯৪ সালের ২৪শে নভেম্বর পিঠাভোগে রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। জেলা প্রশাসক রিয়াজুল হকের সাথে সে সময়ে স্থানীয় রবীন্দ্রপ্রেমীরাও সহযোগিতার হতি প্রসারিত করেছিলেন এটিকে সংরক্ষনের।

এলাকার যুব ও ছাত্ররা তখন বাড়ি বাড়ি ঘুরে টাকা সংগ্রহ করে শুরু করেন রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন। ১৯৯৪’র পর দীর্ঘ ২১ বছর শুধুমাত্র উদ্বোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে সংগ্রহশালার উন্নয়ন পরিকল্পনা। অতি সম্প্রতি সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয় ও প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর কবির আদি নিবাসভূমি সংরক্ষণকল্পে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন। ২৫ শে বৈশাখ-১৪২২ থেকে পিঠাভোগ রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালায় তিনদিন ব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের আদি ইতিহাস : খুলনা জেলার পিঠাভোগ গ্রাম এবং ঘাটভোগ ভৈরব তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ। ভৈরব অববাহিকার স্রোতধারা ধরে যেসব জনপদ গড়ে ওঠে তার অন্যতম প্রাচীন জনপদ পিঠাভোগ-ঘাটভোগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় খানজাহান আলীর আগমনের প্রায় দুই শতাব্দী আগেই এখানে জনপদ গড়ে ওঠে। কুশারী বংশের ইতিহাসও বেশ বিস্তৃত। রবীন্দ্র গবেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ যখন বাংলাদেশ ছেড়ে কলিকাতার জোঁড়াসাকোয় বসতি স্থাপন করেন। তখন সেখানকার অধিবাসিরা সম্মানের সাথে তাদেরকে ঠাকুর নামে অভিহিত করতেন। সেই থেকেই রবীন্দ্রনাথের পরিবার/ কুশারীদের পদবী ঠাকুর হিসেবে পরিণত হয়।

কবিগুরুর পূর্বপুরুষের ভিটার সন্ধানে সরকার : সরকার প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরকে কবিগুরুর  পূর্বপুরুষের বসতভিটা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষের ওই বসতভিটা হচ্ছে বাংলাদেশের খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রাম। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক শীহাবউদ্দিন মো. আকবর জানান, পিঠাভোগ গ্রামে নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের বসতবাড়ীর চিহ্ন  রয়েছে।

প্রাপ্ত স্বীকৃত দলিল-প্রমাণাদি এবং প্রতœনিদর্শনের ভিত্তিতে বাড়ীর অবয়ব, কাঠামো এবং ব্যবহৃত উপকরণ নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয়া হবে। আকবর বলেন, আকাংখা মতো সবকিছু হলে তা হবে এক চমকপ্রদ ঘটনা। কেননা, এই খুলনা জেলায়ই আবার রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ী। খুলনা প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর জানায়,জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে অবস্থিত একটি দেড়তলা পাকা বাড়ী ও সন্নিহিত ১ দশমিক ৪০ একর জায়গা জুড়ে রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ী অবস্থিত। ২০০৫ সালে দক্ষিণডিহি গ্রামের বাড়ীটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়।

বাড়ী নির্মাণে কবি স্বয়ং আর্থিক সহায়তা করেছিলেন বলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে তথ্য সংগৃহীত রয়েছে। ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র প্রণীত এতদাঞ্চলের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘‘যশোর-খুলনা ইতিহাসের’’ ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে পয়োগ্রাম কসবা অধ্যায়ে বিশ্বকোষের পীরালী বিষয়ক অংশ এবং টি ডব্লিউ ফ্যাবেলের ‘দি টেগোর ফ্যামিলি’সহ বিভিন্ন গ্রন্থে বলা হয়েছে, রবীন্দ্র পরিবারের পূর্ব পুরুষ পঞ্চানন কুশারী পৈত্রিক বাড়ীঘর ছেড়ে কোলকাতা চলে যান।

উদ্যমী কুশারী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে চাকরি নেন। তিনি ফোর্ট উইলিয়ামে বসত গাড়েন। পঞ্চানন পুত্র জয়রাম ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ নির্মাণের জন্য পৈত্রিক ভিটা  দেন। তার পুত্র দুর্গনারায়ণ ও পৌত্র গোপীমোহন জমিদারী কিনে  জোড়াসাঁকোতে বিখ্যাত ‘ঠাকুর এস্টেট’ পত্তন করেন। তবে কোনো কোনো ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে রবীন্দ্র-পূর্ব পুরুষেরা প্রথমে যশোরের নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা ছিলেন। ইতিহাস বলছে, খ্রীষ্টীয় চতুর্দশ শতকে খলিফাতাবাদের প্রতিষ্ঠাতা তুর্কি বংশজাত হযরত খানজাহান (রহ.)-এর সময়ে পীরালী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত রবীন্দ্র পরিবারের বিকাশ। আরেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, গভীর সন্তোষের বিষয় যে, কবি রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশের। তার শ্বশুরবাড়িও খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে।

// ০৭-০৫-২০১৫ //