29 জুন 2017

খেলাপি ঋণ ১২ কোটি, ভেস্তে যেতে বসেছে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের উদ্দেশ্য

170316-Khulna Ekti Bai Ekti Kamarপ্রবীর বিশ্বাস:: খুলনার নয় উপজেলায় আছ বছর ধরে চলছে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প। গ্রামের হতদরিদ্র মানুষকে অথনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলেও একটি সুবিধাবাদী শ্রেণী প্রকল্পের ঋণ নিয়ে গড়িমসি করছে। ফলে

জেলায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। ঋণের অর্থ আদায়ে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তৎপর না হওয়ায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। রূপসা উপজেলার জাবুসা গ্রামের ভূমিহীন নারী লিপি বেগম। একটি বাড়ি একটির খামার প্রকল্প থেকে ২০১১ সালে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন গরু পালন।

দুই বছরের মধ্যে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে পরিশোধ করেন ঋণের টাকা। এরপর তিনি ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি গাভী কেনেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই একটি বাছুর দেয় গাভীটি। এখন গাভীতে প্রতিদিন দুই কেজি দুধ দেয়।

ছেলে মেয়ে খায় ও বাকিটা বাজারে বিক্রি করে একশ’ টাকা পান। আগামী ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ হবে ঋণের সমস্ত টাকা। সম্পদ হবে গাভী ও বাছুর। সবমিলিয়ে এখন অনেকটাই স্বচ্ছল তিনি। ভবিষ্যতে গাভির পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন করে আর্থিক মুক্তির স্বপ্ন দেখেন তিনি ও তার পরিবার।

শুধু লিপি বেগমই নয় এই প্রকল্পের ফলে এমন সুখের বাতাস বইছে জেলার অনেক পরিবারে। বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড-বিআরডিবি খুলনা জেলা অফিসের তথ্য অনুযায়ী জেলার ৬৮টি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি অর্থাৎ ৬১২টি সমিতির লক্ষ্য ছিল। সমিতি আছে ৬১৪টি। যার সদস্য সংখ্যা ৩৬ হাজার ৪৯৯ জন। সমিতির সদস্যরা ঋণ নিয়েছে প্রায় ৫৪ কোটি টাকা। এই টাকার মধ্যে রয়েছে সদস্যদের জমানো ২০ হাজার ২৫ লাখ, সরকারি অনুদান ১৬ কোটি ৮৬ লাখ ও সরকারি ঋণ সহায়তা ১৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে নয় হাজারের বেশি গ্রহীতা ঋণ খেলাপি হয়েছেন। তাদের কাছে পাওনা পরিমাণ প্রায় ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

যা এক বছরের অধিক সময় ধরে সদস্যদের কাছে আটকে আছে। এতে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে প্রকল্পের কার্যক্রম। রূপসা উপজেলার জাবুসা গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সভাপতি আবদুল গফ্ফার বলেন, মাত্র আট শতাংশ সুদের হারে পাঁচ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সমিতির সদস্যদের লোন দেওয়া হয়। যা সে সুদ সমেত এক বছরের মধ্যে দেবে। কিন্তু অনেক সদস্য টাকা নিয়ে সময়মতো ফেরত দিচ্ছেনা। এতে করে নতুন করে কোন সদস্য লোন নিতে চাইলে অর্থের অভাবে দেওয়া সম্ভব হয়না।

বিআরডিবি’র উপ-পরিচালক তাফজেল হোসেন বলেন, সমিতির সদস্যরা সময় মতো অর্থ ফেরত না দেওয়ায় সমিতি পরিচালনা করা অসুবিধা হচ্ছে। তবে এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কমিটির সদস্যরা। কেননা প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী সমিতিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কাদের ঋণ দেওয়া যাবে, টাকার পরিমান কত এবং কত দিনে এই ঋণ পরিশোধ করবে। খেলাপীদের বিরুদ্ধে বিআরডিবি থেকে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনও পর্যন্ত ঋণ খেলাপীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব উদ্যোগ ও দারিদ্র বিমোচনে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রকল্পটি। তাই এই প্রকল্পে কোন অনিয়ম থাকলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর খলাপী ঋণ আদায়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে সকল প্রতিবদ্ধকতা দূর করা হবে।

সরকারের ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের বিশেষ উদ্যোগ হচ্ছে ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’। জেলায় এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে। ২০১০ সালে ৬৮ ইউনিয়নে দেয়া বিনামূল্যের গরু, টিন ও হাঁস-মুরুগি। পরবর্তীতে সমিতির মাধ্যমে সদস্য নির্বাচন করে দুগ্ধ খামার, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, ধান উৎপাদনসহ বিভিন্ন কাজে ঋণ দেয়া হয়। যার খেলাপি দাড়িয়েছে বটিয়াঘাটা উপজেলায় ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা, দাকোপে ১ কোটি ৫৩ লাখ, পাইকগাছায় ৫৭ লাখ, দিঘলিয়ায় ৮৭ লাখ, ডুমুরিয়ায় ১ কোটি ৪৯ লাখ, কয়রায় ৩০ লাখ, রূপসায় ১ কোটি ৪৬ লাখ, ফুলতলায় ১ কোটি ৪৪ লাখ ও তেরখাদা উপজেলায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০১৪ সালে শেষের কথা থাকলেও প্রথমে ২০১৬ সালে জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আর দ্বিতীয় মেয়াদে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত।
// ১৬-০৩-২০১৭ //