26 মে 2017

যখন দুজনের কাজের সময় আলাদা

খুলনানিউজ.কম:: কী মায়ায় বা কোন সুতায় যে একটি সম্পর্ক বাঁধা থাকে, তা বলা কঠিন। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়। আবার অনেক সময় কেবল আত্মিক বন্ধনেই বাঁধা থাকে সম্পর্কটি। প্রতিদিন একসঙ্গে যথেষ্ট সময় না কাটানো হতে পারে দাম্পত্য

সম্পর্কের অবনতির কারণ। আবার অনেকের কাছেই এটা কোনো ব্যাপারই না। বর্তমান সময়ে অনেক পরিবারেই স্বামী ও স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। অনেক ক্ষেত্রে দুজনের পেশা আলাদা, কাজের সময়টাও আলাদা হয়। স্বামী হয়তো এমন পেশায় আছেন, যেখানে কাজের সময়টা রাতে। আবার স্ত্রীর কর্মদিবস নয়টা-পাঁচটা। দেখা যায়, সারা দিনে মাত্র অল্প কিছুক্ষণের জন্য দেখা হয় স্বামী-স্ত্রীর। ছুটির দিনেও থাকে নানা কাজ, একসঙ্গে একটু গল্প করারও সময় হয় না। এই দূরত্ব সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। নিজেদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টিও হয়। অনেক ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে একজনকে ছাড় দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয় বৈবাহিক সম্পর্ক।

শারমিন আক্তার ও নাসিম হোসেন (ছদ্মনাম) পারিবারিক মতে বিয়ে করেছেন চার বছর আগে। বিয়ের সময় শারমিন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে চাকরি করতেন, তাঁর স্বামী পারিবারিক ব্যবসা দেখেন। শারমিনের চাকরির সময় পালাভিত্তিক। কোনো কোনো মাসে সকালে, কোনো মাসে বিকেলে ডিউটি পড়ে তাঁর। রাতেও কাজ করতে হয় কখনো-সখনো। নাসিমের অফিস গুলশানে, রোববার তাঁর সাপ্তাহিক ছুটি। অথচ শারমিনের সাপ্তাহিক ছুটি মঙ্গলবার। সেই হিসাবে মাসে একটা দিনও ভালোভাবে দেখা হতো না নিজেদের। এই নিয়ে সব সময় নাসিমের একটা অভিযোগ ছিলই। অথচ বিয়ের আগে শারমিনের কাজের ধরন সম্পর্কে ঠিকই জানতেন তিনি। কিন্তু বিয়ের পর শারমিনের চাকরি করাটা আর পছন্দ হতো না নাসিমের। শারমিন বলেন, ‘খুঁটিনাটি বিষয়গুলোও তাঁকে বোঝানো যেত না। অনেক সময় অফিসে কাজ করছেন, নাসিম ফোন দিলে কেটে দিতে হয়েছে। এতে রেগে যেতেন তিনি। কথা বন্ধ করে দিতেন। সংসারে কোনো মতামত দিলেও রেগে যান নাসিম। বলেন, ‘তুমি বাসায় থাক।’ এসব টানাপোড়েনে বিয়ের দুই বছরের মাথায় চাকরিই ছেড়ে দেন শারমিন।

তবে সব ক্ষেত্রে যে স্ত্রীর ওপর স্বামী অসন্তুষ্ট হন তা নয়। গোলাম সারওয়ার (ছদ্মনাম) একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, সেই সঙ্গে চালান একটি ওষুধের দোকানও। তাঁর স্ত্রী রোকসানা (ছদ্মনাম) একজন ব্যাংকার। সংসারজীবনের কথা বলতে গেলে অভিমান ঝরে পড়ে রোকসানার কণ্ঠে। বলেন, পাঁচ বছরের সংসারজীবনে খুব কম সময়ই তাঁরা একসঙ্গে বেড়াতে গেছেন। ঢাকার বাইরে দুই দিনের জন্য যাওয়ার কথা তো ভাবতেই পারেন না। গোলাম সারওয়ার অফিসের পর দোকানে বসেন, ফেরেন রাত ১২টায়। ততক্ষণে ঘুমাতে চলে যান রোকসানা। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের কাজ সেরেই চলে যেতে হয় অফিসে। রোকসানা জানালেন, বিয়ের তিন বছরের মাথায় বাচ্চা হলে সময়টা যেন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। কথাই হয় না দুজনের। সারা দিন অফিস, সংসার, বাচ্চা সামলে ক্লান্ত তিনি। গোলাম সারওয়ার তো ফেরেন সেই রাতে। না পাওয়াগুলো নিয়ে খুব বিষণ্নতায় ভোগেন রোকসানা। জানালেন, একদম ভালো নেই তিনি।

তবে কর্মজীবন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে সব সময়ই দূরত্ব তৈরি করে—এমনটা মনে করেন না লুবনা ইসলাম (ছদ্মনাম)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর স্বামী প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কর্মরত। দুই বছর বিয়ে হয়েছে তাঁদের। এখনো খুব একটা একসঙ্গে থাকতে পারেননি তাঁরা। লুবনার কর্মস্থল ঢাকা আর স্বামীর টাঙ্গাইল। মাসে এক বা দুই দিন দেখা হয় তাঁদের। ডিউটি থাকায় দিনে কথা বলার সুযোগও পান কম। তারপরও কখনো সম্পর্কে কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয়নি বলে জানালেন লুবনা। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক ভালো আছি। আমাদের চাকরির ধরনই এমন। আমার ডিউটির কোনো ধরাবাঁধা সময় নেই। এটা আমরা দুজনেই জানি। আমি বলে রেখেছি, কথা বলার সময় হঠাৎ করে ফোন কেটে দিলেও রাগ করবে না। সে-ও বোঝে, কাজের জন্য ফোন কেটে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের নিজেদের মধ্যে সমস্যা হয় না। কোনো বিষয়ে খারাপ লাগলে যেভাবেই হোক তাকে জানাই। আলোচনা করলে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। সমস্যা নিজের মধ্যে চেপে রাখি না। বেশির ভাগ সময় পারিবারিক বা কর্মস্থলের অনুষ্ঠানগুলোতে একসঙ্গে যেতে পারি না। এটা নিয়ে দুজনের মধ্যে অভিযোগ নেই।

একটা বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ফারাহ্‌ জাবীন। বিয়ে হয়েছে আট বছর আগে। তাঁর স্বামী রাজিবুল মুকিত নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী। চিকিৎসা বিষয়টিই যেহেতু জরুরি সেবা, তাই সময়-অসময় নেই চিকিৎসকের কাজে। সপ্তাহে দু-এক দিন নাইট শিফটও থাকে। ওদিকে স্বামীরও অফিস করে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। ফারাহ্‌ জাবীন বললেন, ‘দৌড়াদৌড়ি আর ঝক্কি-ঝামেলার মধ্য দিয়েই সংসার চালাতে হয়। সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ছোট ছেলেটাকে ওর বাবা স্কুলে দিয়ে যায়, ছুটির পর আমি নিয়ে আসি। আবার যেদিন রাতে ডিউটি থাকে, সেদিন আগেই রান্নাবান্না করে রাখি। আমরা চেষ্টা করি দুজনের সাপ্তাহিক ছুটির দিনটা এক দিনে রাখতে। এভাবে তেমন সমস্যা হয় না।’

সবকিছু একপাশে সরিয়ে রেখে দুজনের আলাদা করে, একান্ত কিছু সময় কাটানোর প্রয়োজন আছে। হোক না তা দুজনের কোনো আগ্রহের বিষয় নিয়ে টুকটাক গল্প। এমনটাই বললেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মেখলা সরকার। তিনি বলেন, ‘দাম্পত্য সম্পর্ক হলো পরস্পরকে সহায়তা করার। একজন কষ্টে থাকলে আরেকজন কোনোভাবেই ভালো থাকতে পারে না। এ জন্য নিজেদের কথা একে অপরকে জানাতে হবে। তবে তা অভিযোগের সুরে নয়।

কিছু পরামর্শ

*   দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই যদি দুজনের কাজের সময় আলাদা হওয়ার কারণে দূরত্ব তৈরি হয়, তবে আলোচনা করে নিন। আলোচনা সাপেক্ষে একজন চাকরি পরিবর্তনও করতে পারেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

*   একসঙ্গে যে সময়টুকু থাকছেন, তা যেন ‘কোয়ালিটি টাইম’ হয়। সারা সপ্তাহে এক দিন বা অর্ধেক দিন শুধু নিজেদের জন্য রাখতে হবে। ওই সময়টা পরস্পরের খোঁজখবর করে ভালোভাবে কাটালে সম্পর্কটা মজবুত হয়।

*   সারা দিন দেখা না হলেও, ফোনে বা কোনো মাধ্যমে সব সময় যোগাযোগ করে মেসেজ দিয়ে খোঁজখবর নেওয়া উচিত সঙ্গীর। অল্প সময় কথা হলেও ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করা, কাজ কেমন হচ্ছে জানতে চাওয়া—এতটুকুই সম্পর্ককে ধরে রাখে। অর্থাৎ, সম্পর্কে একটা আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। সঙ্গীকে এই আশ্বাস দিতে হবে যে পাশে আছি।

*   সর্বোপরি বোঝাপড়ার বিষয়টি ভালো থাকলে সম্পর্কে দূরত্ব অনেকটাই গৌণ হয়ে যায়।

// ১০-০৫-২০১৭ //