26 জুন 2017

হলে থাকা দিন গুলি

কাজী কোহিনূর বেগম তিথি:: মতিহারের সেই সবুজ চত্তর ছেড়ে আজ আমি বহু দূরে-কর্মব্যস্ত এই জীবনে একটু অবসরে মনে পড়ে গেল সেই গানটি ” সেই যে আমার নানা রংয়ের দিনগুলি- দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না।” বড় কম্পাসে পড়ার আনন্দ -অভিজ্ঞতাই অন্যরকম। খালেদা জিয়া হলে আমার এটাচমেন্ট ছিল। রুমমেটদের সাথে অনেক স্মৃতি বিজড়িত দিনগুলি আজ খুব মনে পড়ছে

রুমমেটরা সকলেই আমরা বিপদে, অসুখে-বিসুখে, আনন্দে পার্শ্বে থেকেছি। হলে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়টাকে- আমি  জীবনের golden time ই বলব কারন আমি মনে করি এরকম জীবনে থেকে নিজেকে তৈরী করা যায় সহজে চেনা যায় নিজেকে। জীবনের প্রতিটা মুহুর্তে এ জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে সুন্দর পথের সন্ধান পাওয়া যায়। দূরদর্শীতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন জেলার ছোট বোন -বড়বোন একসাথে  মিলে এক সাথে থাকার অভিজ্ঞতাই আলাদা ।


সমাজকর্মে সুযোগ পেলাম। ভর্তি হলাম ।যখন প্রথমে খলেদা জিয়া হলে এটাচমেন্ট হল - হলের নিয়ম অনুযায়ী শুরুতে গনরুমে থাকতে হয়নি খুলনার এক বড় আপু শিরিন নাম । উনি math নিয়ে পড়তেন। আমাকে বল্লেন আমি থাকতে তিথি তুমি কেন গনরুমে থাকবে ? হলের খালা অথ্যাৎ আয়ার সহযোগীতায় আমার লাগেজ আপুর রুমে নিয়ে গেলেন। সাত দিন পর আমার রুম এ্যালটমেন্ট হল। এবং রুমমেট চারজন পেলাম। ক্লাস শুরু জানতে পারলাম ।তাপস আমার ভাই আমার সাথে গেল হলে পৌঁছে দিতে।
 
আজ মনে পড়ছে রুমমেটদের কথা -ঘুম থেকে উঠে prayer room  এ আমরা নামাজ পড়তে যেতাম। সামান্য কিছু খেয়ে পড়তে বসতাম তারপর সবাই মিলে কেন্টিনে যেয়ে নাস্তা করে ক্লাসে যেতাম-খালেদাজিয়া হল থেকে মমতাজউদ্দীনে যেতে  সামান্ন পথ পথের দু-পার্শ্বে সারি সারি গাছ- ডিপার্টমেন্টের সামনে খোলা মাঠ- ---
আজি মনে পড়ে
মতিহারের সবুজ চত্তরের কথা
গ্রীস্মের রোদেলা দুপুর আর
শীতের কনকনে হাওয়া।

মনে পড়ে আজি
লাল কৃষ্ণ চুড়ায় মতিহার ঢাকা
বসন্তের পাতা ঝরা
সবুজ ক্যাম্পাসের কথা।

মনে পড়ে আজি
সহপাঠিদের কথা
টি-স্টলে আড্ডা দেওয়া আর
আমার প্রিয় লাইব্রেরির কথা---একসাথে পথ চলার মাঝে একে অপরের প্রতি সহযোগীতার কথা হৃদয়ে দাগ কেটে আছে।রাজিয়া, সম্পা আমার রুমমেট এবং সহপাঠি  -অসুস্থ হলে রাজিয়া আমাকে হাতে তুলে খাওয়াতো, পরীক্ষার সময় ৪/৫ জন মিলে ডিসকাসনের মাধ্যমে পরীক্ষার পড়া তৈরী করতাম, একজন একটা কিছু না বুঝলে অন্যজন তা বুঝিয়ে দেওয়ার সহযোগীতার মনোভাব তা প্রায় অনেকেরই ছিল। কেন্টিনে খাবার নেই রুমের ছোট বড় বোনেরা মিলে ক্যাফেটরিয়া / বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীতের জন্য খাবারের হোটেল জোনাকীতে চলে যেতাম। জোনকীর পাখির মাংস আর কচু শাক ভাজীর কথা আজও ভুলতে পারি না। যখন পরীক্ষার চাপ / ক্লাসের চাপ থাকত বাড়ীতে যেতে পারতাম না। আমার home sickness বেশী ছিল  তখন রুমের বোনেরা / আমার সহপঠী বন্ধুরা রাজিয়া , শম্পা, ইতি, লুসি, শিল্পি আরো অনেকে ওরা আমাকে টি -বাঁধ / আই বাঁধ কখনো বা ভদরা পার্কে নিয়ে যেত - প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই আমরা এমই করতাম । যার জীবন ভালবাসায় পরিপূর্ন তার জীবন সফল্যমন্ডিত জীবন হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। এই জীবন আমাকে তাই বুঝাল।


আবার অসুস্থতায় একজন আর একজনের জন্য রাজশাহী মেডিকেলে চলে যেতাম। এই মায়ামমতার সময়গুলোর কথা ভোলা যায় না। আসলে বাইরে থেকে যারা study তে থাকে তারা প্রায়ই এরকম দিনগুলি উপভোগ করে। তবে এটা উপলব্ধি করি যে এইচ এস সি পাশের পর প্রতিটা মা-বাবা যদি তাদের সন্তানদেরকে বাইরে থেকে পড়াশুনা করানোর সূযোগ দেন তাহলে সেই সন্তান একদিন পূর্নাঙ্গ মানুষ হবার সম্ভাবনা থাকে। কারন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জেলার ছেলে মেয়েরা যখন একজায়গায় থাকে তখন মানুষের ভাল - মন্দ দুটো রুপ দেখা যায়। বেশীরভাগ ছেলেমেয়েরা ভালর রুপটা গ্রহন করে।

আমার রুমে একজন বোন ছিল কাজল যার বাবা কৃষক ছিলেন, আবার আর একটা বোন ছিল যার নাম অর্না তার মা,বাবা মা ডিফেন্স ড: ছিলেন। আর এক বড় বোন আবীর আপা উনি খুব কালো ছিলেন। শুক্লা খুব ফর্সা , কিন্তু আমরা সবাই যে যা রান্না করতাম -একজায়গায় বসে সবারটা সবাই খেতাম এখানে আমাদের মাথায় ধর্ম - বর্ন -গোত্র কাজ করেনি। এভাবে শিক্ষাগ্রহন করলে শ্রেনীবিদ্বেষতা দূর হয়। শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় মানুষ কখনো মানুষ হতে পারে না। এটুকু উপলব্ধি করলাম।

প্রতি বছর রুম পযধহমব হত সবার । রায়হান আনসারী ম্যাডাম ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান অত্যন্ত অমায়িক আমাদেও হলের দায়িত্বে ছিলেন। উনি আমাদের সেটআপ করে দিতেন। সিনিওর জুনিয়র মিলিয়ে।এক বছর লুসি, নাছরিন আমার রুমমেট ছিল  । লুছি জু-লজি নিয়ে পড়ত আর নাছরিন কেমেট্রিতে। খুলনা থেকে একই বছর আমরা বিশজন বন্ধু –বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের -রাজশাহীতে পড়তে গেলাম। হলে যাওয়া -আসার সময় সবাই সবার সাথে কপতাক্ষ ট্রেনে যাওয়া - আসাটা আজ স্মৃতি হয়ে আছে। স্টুয়ার্টরা মাঝে মাঝে এসে বলত আপা চা লাগবে ? / ব্রেড ? কখনো ওদের চা খেতাম কখনোবা বাসা থেকে ছোট ফ্লাস্কে করে আনা চা  সবাইকে নিয়ে খেতাম। কেইবা স্যান্ডউইচ আনত কেউবা অন্য কিছু। ঐ সময়ের একজনের প্রতি আর একজনের আন্তরিকতার কথা সারা দিন লিখলেও শেষ হবে না। আর ঐ আন্তরিকতাগুলো আমার সামনে পথ চলার শক্তি হয়ে আছে। একটু অবসরে ঐ সময়ের এ্যলবামটা যখন দেখি তখন নতুন কিছু করার ভাবনা এসে যায়।

হলে ৭০০-৮০০ মেয়েরা থাকত। কারো সাথে রুমের আন্তরিকতা কারো সাথে হলের ভেতরে মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলতে যেয়ে আন্তরিতা কারো সাথে নামাজের রুমে , কখনোবা টিভিরুমে । আমাদের  তখন চারটা ব্লক ছিল।  কেউ আমাকে আমাদের ব্লকের পুতুল নামে কেউবা রানী নামে ডেকেছে। এখন মনে হয় আমার সেই স্বর্নউজ্জল সময়টা কেন বিধাতা আরো দীর্ঘ করলেন না।

প্রতিটা মানুষের জীবনে একটা সুন্দর  অধ্যায় থাকে এবং সেই অধ্যায়গুলো সবার সাথে শেয়ার করলে  এতে অন্য কেউ সুন্দর ভাবে পথ চলার অনুপ্রেরনা পেয়ে যায়  এবং   আমি খুঁজি আমার আসে পার্শে মানুষের সুন্দর অধ্যায়গুলো   জানার। কারন শেখার শেষ নাই। শুধু মনে হয় এখনো কিছু শেখা হল না জানা হল না।

পরিশেষে বলব মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ বাড়ী ফেরারা পালা আমি সমাজকর্ম ডিপার্টমেন্টে সব ডিপার্টমেন্টের শেষে আমাদের পরীক্ষা হল। হলের কান্নার বন্যা বয়ে গেল -আমরা কেউ ভাবতে পারিনি এত আন্তরিকতার সময়গুলো এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। আমরা সবাই একজন অন্যজনকে সামান্য উপহার দিলাম। এরমধ্যে আমার ছোটবোন সেতু গেল আমাকে আনতে। আপুর মন খারাপ থাকবে একা আসতে খারাপ লাগবে । বাড়ি ফেরার দিন রাজিয়া, সম্পা  বল্ল আজ একসাথে খাব আমরা। যেহেতু আমরা একই ডিপার্টমেন্টের বাড়ি ফেরার দিনও - একই দিনে ধার্য হল। আমরা কাঁদছি - রাজিয়া শম্পাকে আমাকে খওয়ায় দিচ্ছে -সামান্ন কিছু খাওয়ার পর আর কেউ খেতে পারলাম না। এদিকে রুমের ছোট বোনরাও জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। হটাৎ করে রাজিয়াকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না – না বলে ও চলে গেল মনের কষ্টে ও বলে যেতে পারলনা আমি - সম্পা সহ্য করতে পারছিলাম না। রুমের সবাই স্টেশন পর্যন্ত আসল বিদায় জানাতে। রাজিয়া এখনো ফোন করে- সবাই এখন অন্য জীবনে আমরা।   

(লেখিকা: সমাজকর্মী )