25 এপ্রিল 2017

রূপকথার গল্প

কাজী কোহিনূর বেগম তিথি:: রূপকথাকে একদল ছেলে তুলে নিয়ে গেল। লতা পশে দাড়িয়ে দেখল। সে ভয়ে কিছু বল্ল না।নিরুপম এই কাজটা জেদ করে করল কারন রূপকথার বোন ক্লান্তিকে নিরূপম বিয়ে করতে চেয়েছিল। সে এবং তার পরিবার রাজি না হওয়াতে প্রতিশোধ নিল রূপকথাকে তুলে নিয়ে বিয়ে করল। তারপর শুরু করল অমানুষিক অত্যাচার।

আমার ভাই-বোনদের সাথে তোমাকে মিলে থাকতে হবে-যদি আমার ভালবাসা পেতে চাও-স্ত্রীর অধিকার পেতে চাও। তোমার বোনতো রাজি হল না, তোমাকে বিয়ে করে দেখায়ে দিলাম।চটপটে রূপকথা নিশ্চুপ হয়ে গেছে। রূপকথার অনেক গুন। সে সহ্য করতে পারছিল না। একটা বখাটে ছেলে তার জীবনটাকে ওলট -পালট করে দিল।

নিরুপম, রূপকথাকে মানুষিক নির্যাতন করা শুরু করে। তোমার বাপের বাড়ীতে ফোন দিয়ে বল, আমাদেরকে মেনে নিতে। মেনে নিল তার বাবা - মা।আমার ভাই-বোন ছাড়া কখনো বাপের বাড়ী যেতে পারবে না। আমি যখন যা আনব আগে আমার ভাইবোনদের দিয়ে যা থাকে সেটা তুমি নিবে। রুপকথা বল্ল তাহলে আমার নাম করে  সব অনো কেন--? এর মধ্যে ছোট ননদ এসে নুপুর জোড়া চাইল অতি সখের নুপুরটা দিল-পরে আর সেটা পাওয়া গেল না-একবার চেয়েছিল ননদ আর সেটা খুঁজে পায় না। এভাবে তার সৌখিন জিনিস গুলো এক এক করে নিয়ে যায় ফেরত আর পাওয়া যায় না। তার স্বামীকে বলে কোন সুরাহা হবে না কারন তার স্বামীর কথা তার ভালবাসা পেতে হলে তার ভাইবোনদের সন্তষ্ট করে চলতে হবে-রুপকথা সব সময় সৃষ্টিকর্তাকে ডাকে যে-হে বিধাতা কেমন জীবন চেয়েছিলাম  - কোন জীবন ভোগ করতে হচ্ছে ? স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্কটা আসলে কি ? ভেবেছিলাম আমি আর্ট করব অবসরে। কিন্তু নিরুপম বলে,এ সব কি আঁকাআঁকি কর বলে সে ছিড়ে ফেলে-আর বলে আমার বোনরা যা করে না তা তুমি করতে পারবে না।  

রুপকথা ভেবেছে বিয়ে যখন হয়েছে-স্বামীর মন রক্ষা করে তার মেধাটাকে বিকশিত করবে আর সে বুঝে গেছে বেবী নেওয়ার প্রতি স্বামীর কোন আগ্রহ নাই তাই সে, নিজের যোগ্যতাটাকে কাজে লাগিয়ে সমাজ কল্যান মূলক কাজে অংশ নিতে চাইছে। সেজন্য সে তাদের যুগল ছবি বেড রুমে বাঁধাই করে রাখল স্বামীর মন রক্ষা করার জন্য। ছোট ননদ পরক্ষনে সেটা সরিয়ে ফেল্ল।সেটার প্রতিবাদ করতে যেয়ে রুপকথাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে স্বামীর কাছ থেকে।

রুপকথা দেখল তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এদিকে তার স্বামীর বিদেশে যাওয়ার ভিসা চলে আসছে। সে দেখল স্বামীর বর্তমানে যেখানে সম্মান নেই তার অবর্তমানে কিভাবে এখানে থাকবে। তাই সে তার স্বামীর সাথে বাপের বাড়ী বেড়াতে  এসে থেকে যায়। ক’দিন পর ফিরে যাবে বলে। স্বামী বিদেশে চলে যায়। পাঁচ বছর কেটে গেল মাঝে একবার শ্বশুর বাড়ী গেল মিথ্যা অভিযোগের স্বীকার হয়ে আবার বাপের বাড়ী ফিরে আসতে হলো। নিরুপম, স্ত্রীকে এই পাঁচ বছরে আর খরচ দেয়নি তার ভাইবোনদের সাথে মিলে থাকতে পারিনি বলে।

রুপকথা দেখল একটু একটু করে নিজেকে টিকে থাকার জন্য তৈরী করতে হবে।সে আবার রং তুলি ধরল। আর একটা ¯কুলে জয়েন করল। এর মধ্যে অনেক সামাজিক উন্নয়ন মূলক সংগঠনের সাথে সংযুক্ত হলো। রুপকথার একক এক্সজিবিশন হবে চারিদিক ছড়িয়ে পড়ল। আর্টের উপর সে এওয়ার্ড পেল। এর মধ্যে স্বামী দেশে আসলো। ঘরে ঢুকে এ্যাওয়ার্ড দেখে বল্ল এসবতো টাকা দিয়ে আজকাল কেনা যায়। রুপকথার মনটা ফিউজ হয়ে গেল স্বামীর এই উক্তিতে। নিরুপম কাপড় ছাড়তে ছাড়তে বল্ল, মেয়ে মানুষদের রান্নাঘর ছাড়া মানায় না। এসব বাদ দেও। রুপকথা বল্ল বেবী নিতে চাও না- তোমার ভাই-বোনদের বাচ্চা দেখতে বলো ,স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চাও না-যদি আমার আগে তোমার মৃত্যু হয় কিভাবে চলব ? তুমি বল মৌখিকভাবে ভাইবোনদের বলে যাবে। কি সুন্দর তোমার ফয়সালা ? দেখ , তোমার আর আমার দৃষ্টিভঙ্গীতে আকাশ আর মাটির পার্থক্য। এভাবে চলে না জীবন। আর তুমি আবার বিদেশে যাবে -পাঁচ বছর বিধবাদের মত একা থেকেছি আর পারব না। নিরুপম বল্ল যেসব মেয়েদের স্বামীরা বিদেশে থাকে তুমিও সেরকমই থাকবে। আর বাপের বাড়ী যাবে ? তোমাকে এখন কে  বিয়ে করবে ?  করছতো  স্কুল জব এর চেয়ে ভাল জব কে দিবে ? রুপকথা বলল তোমার বড়বোন একথা বলেছে তোমার অবর্তমানে বলেছে-যে, তুমি কি করতে পার চাকুরিওতো করতে পার না। রান্নাও করতে পার না। আর এখন আমি স্কুল জব করি আর অবসরে মহিলাদের চাইনিজ রান্নাও শিখাই। নিরুপম বল ্ল কোথাও যেতে পারবা না। আমার বোনরা জব করে না তাই তুমিও করতে পারবা না। দেখি তোমার সার্টিফিকেট কোথায় ? সব ফেলে দেব। আর শোন যেখানে যাও আমার বোনদের সাথে নিয়ে যাবা-যা করবা আমার বোনদের সাথে নিয়ে করবা। তা না হলে আমার সাথে সংসার করতে পারবা না। রুপকথা বল্ল আমিও চাই না তোমার সাথে আর কন্টিনিউ করতে। নিরুপম সাথে সাথে রুপকথার রংতুলি আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস জানালা দিয়ে পার্শের ডোবায় ফেলে দিল। রুপকথা বল্ ল আলোচনায় সমাধান কর- তা হলে তোমার মুরব্বী এবং আমার মুরব্বীদের ডেকে ফয়সালা কর। তা না হলে আমি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সমাধানে যাব। নিরুপম বল্ল, আমি সমাধানে যাব না তোমাকে এভাবেই থাকতে হবে। দেখি তোমার সংস্থার কে কে আমাকে ফোন করে ? রুপকথা কয়েকমাস অপেক্ষা করল যদি সহজ সমাধান হয়। অবশেষে সংস্থার মাধ্যমে গেল। নিরুপমকে বল্ল, আমার জীবনে অন্যায়ভাবে প্রবেশ করাটা তোমার ঠিক হয়নি। ভালবেসে ঘর বাধঁতে হয়-তাহলে সংসারটা সুখের হয়। মনে রেখ তোমরা, আমার সাথে যে ব্যবহার করেছ প্রকৃতির শাস্তি তোমাদের একদিন পেতেই হবে। রুপকথা স্কলারশীপ পেল ডিভোর্স লেটার সংস্থার মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়ে পড়াশুনা করতে বিদেশে চলে গেল। এদিকে রুপকথার বাবা-মা -ভাইবোন নারাজ অনেক আগে রুপকথাকে সরে আসতে বলেছিল, রুপকথা বলেছিল অন্যায়ভাবে বিয়ে করলেও বিয়ে যেহেতু একবার হয়েছে শেষ চেষ্টা করি যদি  সম্মানের সাথে জীবন কাটানো যায় ।মেয়ের চিন্তায় তারা অসুখে বিছানায় পড়ে গেল।

আমাদের দেশে রুপকথার কাহিনী ঘরেঘরে। সব মেয়েরাই শিক্ষিতা নয় যে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াবে। অনেক রুপ কথার জীবন অনাাদরে অবহেলায় অকালেই ঝরে যায়। রুপকথা প্রতিজ্ঞা করল- দেশে ফিরে নারী কল্যান সোসাইটি করবে প্রতিটি জেলায়। যাতে অবহেলিত নারীরা তাদের মনের কথা বলে এই সোসাইটি থেকে আল্লাহ্র রহমতে সমাধান পায়। বান্ধবী লতা প্রতিজ্ঞা করল তার সাথে থাকবে।

পরিশেষে বলব, সব মানুষের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা উচিত কারন -

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃনা
তারে যেন তৃন সম দহে।।

// লেখিকা এবং সমাজকর্মী //