29 মে 2017

কিশোরগঞ্জের দুই রাজাকারের ফাঁসি

খুলনানিউজ.কম:: একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে কিশোরগঞ্জের মোহাম্মদ মোসলেম প্রধান ও পলতাক সৈয়দ মো. হোসেইনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের

ট্রাইব্যুনাল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে বুধবার এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আসামিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সাজা কার্যকর করতে বলেছে আদালত। সেই সঙ্গে পলাতক মো. হুসাইনকে গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে রায়ে। এ বিষয়ে প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতে বলা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর সদস্য হয়ে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণ ও নির্যাতনের ছয় অভিযোগ আনা হয় এই দুই আসামির বিরুদ্ধে। ছয়টি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। তিন নম্বর অভিযোগে সর্বসম্মতভাবে দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া পাঁচ নম্বর অভিযোগে এ দুইজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া চার নম্বর অভিযোগে সৈয়দ মো. হোসেইনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য তিন অভিযোগে তাকে আরো ২২ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ সাংবাদিকদের বলেন, এই মামলা পরিচালনায় আমরা সফল। দুই আসামির বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। এমধ্যে দুইটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিনটি অভিযোগে ২২ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।  

তুরিন বলেন, এই রায়ে প্রথমবারের মতো যুদ্ধকালীন ধর্ষণকে গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। একাত্তরের গণধর্ষণকে আদালত ‘জেনোসাইডাল রেপ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, ওই চার্জে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এটা আমাদের জন্য বিরাট সাফল্য।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুস সাত্তার পালোয়ান বলেন, আমরা সাক্ষীদের জেরার সময় এটা প্রমাণ করতে পেরেছি যে ওই সময়ে ওই এলাকায় কোনো রাজাকার কমান্ডারই ছিল না। যুদ্ধকালীন বিশেষ কিছু ঘটনাকে সাধারণ ঘটনায় রূপান্তর করে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আমরা ট্রাইব্যুনাল ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মক্কেলের সঙ্গে পরামর্শ করে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই দুইজনের বিরুদ্ধে হত্যা ও গণহত্যাসহ আনুষ্ঠানিক ছয়টি অভিযোগ দাখিল করেন রাষ্ট্রপক্ষ।

তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

প্রথম. নিকলীর দামপাড়া গ্রাম ও নিকলী থানা ভবন, সদরের মহাশশ্মান এলাকায় একাত্তর সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হোসাইনের বিরুদ্ধে ছয় নারীকে ধর্ষণ, সুধীর সুত্রধরসহ ৩৫ জনকে হত্যা ও বাদল বর্মনসহ চারজনকে নির্যাতন।

দ্বিতীয়. নিকলী বাজার ও থানা কম্পাউন্ড এলকায় হোসাইন ও মোসলেমের নেতৃত্বে একাত্তরের ২ সেপ্টম্বর থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত কাশেম আলীসহ চারজনকে আটক ও নির্যাতন।

তৃতীয়. নিকলীর গুরুই গ্রামের পূর্বপাড়ায় ১৯৭১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ফুল মিয়াসহ ২৬ জনকে হত্যা এবং ২৫০টি বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ।

চতুর্থ. নিকলীর নানশ্রী গ্রামে একাত্তর সালের ২১ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তোফাজ্জল খান জিতুসহ সাতজনকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ হোসাইনের বিরুদ্ধে।

পঞ্চম. একাত্তর সালের ১০ অক্টোবর নিকলী সদরের পূর্বগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল মালেককে তার নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করে হত্যার অভিযোগ হোসাইন ও মোসলেম প্রধানের বিরুদ্ধে।

ষষ্ঠ. ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটা থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল জাহান ও মো. সেলিমকে হত্যা করে তাদের মৃতদেহ রাজাকার হোসাইন কিশোরগঞ্জ পৌরসদর, প্যারাভাঙা ও শোলাকিয়ায় রিকশা দিয়ে ঘুরিয়েছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল জাহানের মাকে তার ছেলের রক্ত দেখিয়ে বীভৎসতা প্রদর্শন করেছিলেন।

সৈয়দ মো. হুসাইন ওরফে হোসেন

ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃতুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সৈয়দ মো. হাসান ওরফে হাছেন আলীর ছোটভাই হলেন সৈয়দ মো. হোসেইন। তিনি ১৯৫১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার স্থায়ী ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছিহাতায়। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কিশোরগঞ্জের হয়বতনগরে থাকতেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তিনি ১৯৬৯ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে এসএসসি ও ১৯৭৫ সালে বিএ পাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মতাদর্শ গ্রহণ করেন। ওই সময় নিকলী থানা এলাকায় রাজাকার দারোগাহিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।

মো. মোসলেম প্রধান

মোসলেম প্রধান ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার কামারহাটি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই; তবে অক্ষরজ্ঞান আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নিকলী ইউনিয়নের রাজাকার কমান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং কিশোরগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তিগত ও যৌথভাবে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে মোসলেম প্রধান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

// ১৯-০৪-২০১৭ //