24 মে 2017

আসছে মুসলিম সামাজিক ওয়েবসাইট ‘সালাম ওয়ার্ল্ড’

খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ:: মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্বশীল বৃহৎ সামাজিক ওয়েবসাইট ‘সালাম ওয়ার্ল্ড’ এর নির্মাণ প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে প্রথম সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় কিছুদিন আগে তুরস্কের ঐতিহাসিক ইস্তাম্বুল নগরীতে।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিগণ এ বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর বিষয়ে একমত পোষণ করেন। সম্মেলনটিতে অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন মুসলিম দেশের ৪০ জন প্রতিনিধি।

সালাম ওয়ার্ল্ড হবে সামাজিক ওয়েবসাইট। ইন্টারনেট-দুনিয়ায় নিজেদের (মুসলমান) গোচরীভূত নিত্য চ্যালেঞ্জ ও প্রাত্যহিক সমস্যাবলির সমাধানের লক্ষ্যে ওয়েবসাইটটির জন্ম। বিশ্বের ১৫টি ভাষায় এর সংস্করণ থাকবে। এটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সর্বব্যাপী মিডিয়াযুদ্ধের সর্বাত্মক মুকাবিলায় জোরালো প্রতিরোধমূলক অবস্থান নিয়ে কাজ করে যাবে। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এর প্রধান কার্যালয় থাকবে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিখ্যাত শহরগুলোতে এর ব্যুরো অফিস খোলা হবে। অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে কায়রো, লন্ডন, নিউইয়র্ক, দুবাই ও মস্কোর নাম ।

আল জাজিরার প্রতিবেদন মতে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত মুসলিম-অমুসলিম তরুণদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে এই সাইটের ভিত রচিত হবে। এটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, সীমাবদ্ধতা ও শর্ত-প্রাচীরের ঊর্ধে উঠে মুসলিম তরুণদের পথ দেখাবে। ওয়েবসাইটি পরিচালনায় প্রদেয় টেক্স ও অন্যান্য ব্যয় কয়েকজন মুসলিম ব্যবসায়ী বহন করবেন।

একই সঙ্গে পনেরটি ভাষায় প্রদর্শিত সাইটটি ইসলামসম্পর্কিত ব্যাপক তথ্যাবলি ও ইসলামের সঠিক রূপটি বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে। যাবতীয় বিতর্ক এড়িয়ে খাঁটি ইসলামি জ্ঞানসম্ভার ধারণ করবে এ সাইট। যাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলেই ইসলামের সঠিক অবয়কটির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন এবং ইসলামের বিশ্বজনীন জীবনাদর্শের সৌন্দর্য তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। ওয়েবসাইটির অন্যতম উদ্দেশ্য অমুসলিম সংবাদমাধ্যম কর্তৃক ইসলামের বিরুদ্ধে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মুকাবিলা এবং এর ফলে সৃষ্টি ভুল ধারণার অপনোদন।

উল্লেখ্য, এক রিপোর্ট মতে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মুসলিম তরুণদের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আল-জারিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ার তরুণদের মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয়তা ব্যাপকহারে বেড়েছে। এখানে কথায় কথায় লোকেরা বলে - ‘টুইটারের আওয়াজ জনতার ধ্বনি।’ বর্তমানে গোটা বিশ্বের ফেসবুক ও টুইটার ব্যবহারকারীদের তালিকার শীর্ষে ইন্দোনেশিয়ার স্থান তৃতীয়। ইন্দোনেশিয়ায় ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ রীতিমত শুরু হয়েই গেছে।

এর কারণ হলো, বর্তমানে দেশটিকে পৃথিবীর সামাজিক সম্পর্কের রাজধানী বলা হয়। প্রায় একইভাবে আরব রাষ্ট্রগুলোতে তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটসমূহের ঝুঁকছে ক্রমবর্ধমান হারে। টুইটারে ব্যবহৃত ভাষাগুলোর মধ্যে পঞ্চম স্থানের মর্যাদা আরবির অধিকারে। উপরিউক্ত কারণসমূহ ও বাস্তবতার আলোকে মুসলিম বিশ্বের একটি ব্যাপক, শক্তিশালী ও বৃহৎ ওয়েবসাইট থাকা জরুরি।

প্রাপ্ত তথ্য মতে এই ওয়েবসাইটে ইসলামের কেবলই ইবাদত নয়, আর্থিক লেনদেন, ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের দিকনির্দেশনামূলক নীতিমালা, খেলাধূলা, শিক্ষা-সংস্কৃতি-বিনোদন প্রভৃতি বিষয়ে আলিমসমাজ, ইসলামি আইনবিদগণের মতামত, চিন্তক-বিশ্লেষকদের গবেষণার আলোকে নিত্য-নতুন ইসলামি রচনা-উপাত্তের সাহায্যে ব্যাপক দিকনির্দেশনার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

প্রকল্পের পরিচালক, আহমদ উজবান তুর্কী বলেন, “এ বিষয়ে এটিই হবে গোটা ইসলামি বিশ্বের প্রথম বিষয়ভিত্তিক তথ্যভান্ডারের প্রজেক্ট। যা সারা দুনিয়ার মুসলমান-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও সন্তোষজনক গাইডলাইন প্রদানে সহায়ক বিবেচিত হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলমানদের অবস্থা, তাদের জীবনে নেমে আসা নানান পরিস্থিতি ও ঘটনাঘটনের তরতজা সংবাদ পরিবেশিত হবে সাইটটি ভিজিটকারীদের জন্য।”

তিনি আরো বলেন, “এই সাইট পুরো পৃথিবীতে  মুক্ত কলেবরে, বিস্তীর্ণ পরিসরে ইসলামের পয়গাম পৌঁছে দেবে। সাইটটি সমগ্র বিশ্বের শীর্ষ ইসলামি গবেষকদের সেবা গ্রহণ করবে। একই ধারাবাহিকতায় নেয়া হবে মুসলিম দুনিয়ার বিশেষজ্ঞ মিডিয়া ব্যক্তিত্বগণেরও সহায়তা। তখনই কেবল ‘সালাম ওয়ার্ল্ড’ মিডিয়াযুদ্ধের শিকার নির্যাতিত মুসলমানদের মুখপত্র হয়ে উঠবে। বিশ্বের বিভিন্ন অমুসলিম দেশে অন্যায় আচরণ ও ভয়ানক নিগ্রহের শিকার মুসলমান জনগোষ্ঠী এবং ইসলামবিদ্বেষীদের অপপ্রচারের যুৎসই জবাব দিতে প্রয়োজন মিডিয়া-ব্যক্তিত্ববর্গের কার্যকর সহায়তা।

মার্কিন ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের ডিরেক্টর নেহাদ ইওয়াজ সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, “পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ মানুষ ইসলামের ব্যাপারে খণ্ডিত ধারণা পোষণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ১০ শতাংশ মার্কিনী মনে করে মুসলমানরা চাঁদের উপাসনা করে! পশ্চিমা গণমাধ্যম ইসলামকে অত্যন্ত জঘন্যভাবে চিত্রায়িত করছে। তারা মুসলমানদের সম্পর্কে পৃথিবীর মানুষকে বিভ্রান্ত করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করে না। অথচ আমেরিকা ও ইউরোপে সর্বোচ্চ গতিতে বিকাশমান ধর্ম হিসেবে ইসলামের নামই উঠে আসছে। কিন্তু ইন্টারনেট ও গণমাধ্যমের জগতে শক্তিশালী ও ব্যাপকভিত্তিক পথনির্দেশনার অভাব প্রকট। যা আছে তা অপ্রতুল ও অসম্পূর্ণ। এ  কারণেই ‘সালাম ওয়ার্ল্ড’ হবে ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতাবিষয়ক যাবতীয় জিজ্ঞাসার জবাবে এক সমৃদ্ধতম উৎস। যা একই সঙ্গে ১৫টি ভাষাভাষী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি তাদের সচেতনও করবে।”

অনুষ্ঠানে বিখ্যাত আরব্য শিক্ষাবিদ ড. সুওয়াইদানও অংশগ্রহণ করেন এবং এ ধরনের ওয়েবসাইটের প্রয়োজনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ৪০টি মুসলিম দেশের স্কলার ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বগণ সম্মেলনে সম্মিলিতভাবে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়েই এ বিষয়ক পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত করতে সর্বাত্মক প্রয়াসের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

(০৩-০৬-২০১২)