29 জুন 2017

তার গুরু তার বন্ধু

150604-guru-friendsখুলনানিউজ.কম:: কিছু ছাত্র থাকে, যাকে ‘বিশেষ কোনো কারণে’ শিক্ষকের মনে ধরে যায়। তাকে ছাড়া ক্লাস নিতেই মন চায় না। কখনো কখনো শিক্ষকের মনে হয়, ছেলেটি থাকলে ভাল হতো। ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের এমন দুর্বলতা দেখে কেউ কেউ চোখ বড় করেন। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে জুবায়ের-হাথুরেসিংহেকে নিয়ে

এখন এমন অবস্থা বিরাজ করছে। মেধাবী ছাত্র জুবায়েরকে তিনি এতটাই পছন্দ করেছেন যে, তাকে ছাড়া মাঠে নামতেই চাচ্ছেন না। বিশ্বকাপের আগে দেশ ছাড়ার সময়ও এমন হয়েছিল। কিন্তু সেবার নিজের চাওয়া পূরণ করতে পারেননি তিনি।   

জুবায়েরের জাতীয় দলে ডাকা পাওয়াটাও নাটকীয়তায় ভরা। গত বছরের কথা। জুবায়ের তখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের নিয়মিত খেলোয়াড়। ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জুবায়েরের ‘বড় ভাইরা’। হঠাৎ নেটে ডাক পড়ল তার। মুশফিক-সাকিবদের সামনে বল করলেন তিনি। তার লেগ স্পিনে বেশ কয়েকবার অস্বস্তিতে পড়েন তামিম-সাকিবরা। দূরে দাঁড়িয়ে আপন মনে তা দেখেন তৎকালীন নতুন কোচ হাথুরেসিংহে। তারপর কোচসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটার নির্বাচকদের বলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের প্রাথমিক দলে জুবায়েরকে রাখতে। সেই সিরিজে অল্পের জন্য খেলা হয়নি তার। সিরিজ চলাকালীন সোহাগ গাজীর বোলিং প্রশ্নবিদ্ধ হলে হবে-হবে করে অভিষেকে বিলম্ব হয় জামালপুরের এই তরুণের। শেষমেশ গত বছরের সেপ্টেম্বরে জুবায়েরের ডাক পড়ে ‘এ’ দলে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওই সিরিজে ১৬ উইকেট নিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন কেন জাতীয় দলের কোচ তাকে এত পছন্দ করেন। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিনিয়র দলে ডাক পেয়ে যান তিনি।

জাতীয় দলেও গুরুর মান রাখেন জুবায়ের। তিন টেস্টে ২৯.২৭ গড়ে নেন ১১ উইকেট। ওয়ানডেতেও আস্থার প্রতিদান দেন। দুই ম্যাচে দখল করেন চার উইকেট। এরপর হঠাৎ করে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই জুবায়েরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন নির্বাচকরা। ‘গুরু’ হাথুরেসিংহের তীব্র ইচ্ছার পরও ব্রাত্য থেকে যান বিশ্বকাপে। পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে খেলার কথা থাকলেও গোড়ালির ইনজুরির কারণে মাঠে নামতে পারেননি।

জাতীয় দলের মতো আবাহনীতেও জুবায়ের নিঃসঙ্গ থেকেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আলো ছড়ানোর পরও পরের দুই মাসে মাত্র একটি ম্যাচে তাকে মাঠে নামান ক্লাব কর্তারা। যুক্তি একটাই- লেগস্পিনার খেলানোর ঝুঁকি তারা নিতে চান না। বাংলাদেশের কন্ডিশনে লেগস্পিন নাকি বেমানান!

দেশের কর্তারা জুবায়েরকে দাম না দিলেও ভিনদেশিরা জুবায়েরকে ঠিকই মূল্য দেন। তার প্রমাণ মেলে পাকিস্তান সিরিজের একটি ঘটনা থেকে। খুলনা টেস্টের প্রাকটিসে একবার নেটে বল করছিলেন জুবায়ের। আম্পায়ার পজিশনে ছিলেন ইয়াসির শাহ। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন তার লেগস্পিন। ইয়াসির জুবায়েরের কাছে জানতে চান তিনি কীভাবে বল গ্রিপ করেন। সেই সঙ্গে অনুরোধ করেন গুগলিটা শিখিয়ে দিতে। জুবায়ের ইয়াসিরকে বলেন, তিনিও এখনো গুগলিটা ভালোমতো শিখে উঠতে পারেননি। ইয়াসির জুবায়েরের উত্তর শুনে মজা করে বলতে থাকেন, ‘মিথ্যাবাদী, মিথ্যাবাদী...।’

জুবায়ের খেলতে না পারলেও বসে থাকেননি। সিরিজ চলাকালীন পাকিস্তানের স্পিন কোচ কিংবদন্তি লেগস্পিনার মুশতাক আহমেদের সঙ্গে কথা বলেছেন। শিখতে চেয়েছেন। মুশতাক তাকে কিছু নোট দিয়েছেন। সেগুলো মেনে চলার চেষ্টা করছেন জুবায়ের।

জুবায়ের মুশতাককে বলেন, আমি মাঝে মাঝে বেশি রান দিয়ে ফেলি। তখন বুঝতে পারিনা রান আটকানোর জন্য বল করব, নাকি উইকেটের দিকে নজর দিব। উত্তরে মুশতাক বলেন, ‘এভাবে কখনো চিন্তা করবে না। তুমি উইকেটের জন্যই বল করবে।’

জুবায়ের অপেক্ষায় আছেন ভারতের বিপক্ষে উইকেটের জন্য বল করতে। কিন্তু তাকে নিয়ে কোচ-নির্বাচকের অহেতুক বিরোধে স্বস্তিতে নেই তিনি। গতকাল দল ঘোষণা পর সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদের শরীরী ভাষাই বলে দিচ্ছিল জুবায়েরকে অনেকটা বাধ্য হয়ে দলে রেখেছেন তারা। কিন্তু জুবায়ের এভাবে দলে থাকতে চান না। টেলিফোনে বললেন, যে যোগ্যতা দিয়ে ভিনদেশি গুরুর মন জয় করেছেন, সেই যোগ্যতা দিয়েই লাল-সবুজের জার্সিতে স্থায়ী হতে চান তিনি। বুঝতে পারছেন, তিনি যখন হাত ঘোরাবেন, তখন ড্রেসিংরুমে চলবে শীতল যুদ্ধ। ‘গুরু’ চাইবেন, শিষ্য দেখিয়ে দিক। ‘অন্য কেউ’ হয়তো উল্টোটা চাইবেন।

জুবায়ের কি পারবেন?
// ০৪-০৬-২০১৫ //