পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ

পাকিস্তানের শেষ উইকেট জুটিটি ভাঙার জন্য কি আপ্রাণ চেষ্টাটাই না করলেন রুবেল হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান। কিন্ত এই দু’জনের দুটি করে ওভারে কিছুতেই উইকেট বিলালেন না শাহিন শাহ আফ্রিদি ও জুনাইদ খান। না বিলালে কি হবে! বাংলাদেশের জয় তো নিশ্চিত হয়ে গেলো মোস্তাফিজুর রহমান শেষ ওভার শুরু করার আগেই। ৬ বলে ৩৮ রানের সমীকরণ মিলানো তো আর তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যদি ভুতুড়ে কিছু না হয়। বাংলাদেশ বরং ৩৭ রানের জয় তুলে জায়গা করে নিল এশিয়া কাপের ফাইনালে।

এনিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠলো টাইগাররা। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ঘরের মাঠে এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলেছিল বাংলাদেশ। সেবারের মতো এবারের ফাইনালেও বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত। টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটের সেই আসরের ফাইনালে অবশ্য বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে হেরে যায়। এবার টাইগাররা পারবে প্রথমবারের মতো বহুজাতিক কোনো আসরে শিরোপা জয় করতে? ২০১২ সালে ওয়ানডে ফরম্যাটের এশিয়া কাপ ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে ২ রানে হেরে শিরোপার স্বপ্ন অধরা থেকে গিয়েছিল বাংলাদেশের।

আবু ধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে টস জিতে আগে ব্যাট করে ৪৮.৫ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২৩৯ রান করে বাংলাদেশ। জুনায়েদ খান ও শাহিন শাহ আফ্রিদির দাপটে ১২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল টাইগাররা। এরপর মুশফিকুর রহীমের ৯৯ ও মোহাম্মদ মিঠুনের ৬০ রানে ভর করে লড়ার পুঁজি দাঁড় করায় মাশরাফি বিন মুর্তাজার দল। জবাবে টাইগারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের মুখে ১৮ রানে ৩ উইকেট হারায় পাকিস্তান। পরে ইমাম-উল-হক, শোয়েব মালিক ও আসিফ আলির চেষ্টা বৃথা যায় মোস্তাফিজ-মিরাজদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের কাছে। উইকেটের পিছনে লিটন দাসের দুটি ক্যাচ মিস ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের শুরুর দিকে একটি রান আউট মিস বাদ দিলে ম্যাচ জুড়ে দুর্দান্ত ছিল টাইগারদের ফিল্ডিং।

অথচ ২৩৯ রানের পুঁজি নিয়ে বাংলাদেশ এই ম্যাচ জিতে ফিরবে এই বিশ্বাস খুব কম লোকেরই ছিল প্রথমে। ইনজুরির কারণে সাকিব আল হাসান নেই। আবু ধাবিতে যখন ম্যাচ চলছে, সাকিব তখন দেশে ফেরার বিমানে। আর সাকিব না থাকা মানে বাংলাদেশ দলের দুই জন খেলোয়াড়ের অভাব—একজন ব্যাটসম্যান ও একজন বোলার। গুরুত্বপূর্ণ এ ম্যাচে সাকিবের বোলিং তাই মহাগুরুত্বপূর্ণই ছিল।

অধিনায়ক মাশরাফি মাঠের নেতৃত্বের জন্য এদিন সবার বাহবা দাবি রাখেন। তার বোলিং ব্যবহার ছিল দেখার মতো। যখন যেখানে যাকে ব্যবহার করেছেন তারাই সাফল্য এনে দিয়েছেন দলকে। এম্যাচে সাকিবের জায়গায় একাদশে আসেন মুমিনুল হক। ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্তর জায়গায় আসেন সৌম্য সরকার। আর স্পিনার নাজমুল ইসলাম অপুকে বসিয়ে একজন বাড়তি পেসার হিসেবে নেওয়া হয় রুবেল হোসেনকে।

মিরাজকে দিয়ে বোলিং শুরু করেছিলেন মাশরাফি। এই স্পিনার প্রথম ওভারেই ফিরিয়ে দেন ফখর জামানকে। রুবেল হোসেন দুর্দান্তভাবে ফখরের ক্যাচটি দেন মিড অনে। পরের ওভারে মোস্তাফিজ আক্রমণে এসেই তুলে নেন বাবর আজমকে। ১ রান করে এলবিডব্লিউ এই ব্যাটসম্যান। নিজের পরের ওভারে ফিরেই পাকিস্তান অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদকেও ফিরিয়ে দেন মোস্তাফিজ। উইকেটের পেছনে ১০ রান করা সরফরাজের ক্যাচটা দুর্দান্তভাবে নেন মুশফিকুর রহীম। ১৮ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান পড়ে যায় প্রবল চাপে।

সেই চাপ থেকে পাকিস্তান মাথা চাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছে ওপেনার ইমাম-উল-হক, শোয়েব মালিক ও আসিফ আলির ব্যাটে। কিন্তু টাইগারদের যে তখন জয়ের নেশা পেয়ে বসেছে। দুর্দান্ত সব ফিল্ডিং দেখা মিলল এদিন লাল-সবুজের জার্সিধারীদের। পায়ে এতো এতো অপারেশনের ক্ষতকে উপেক্ষা করেও ফিল্ডিংয়ে বার বার ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেল মাশরাফিকে।

৭ ওভার বল করে মাশরাফি ৩৩ রান খরচায় কোনো উইকেট পাননি। কিন্তু এম্যাচ জয়ে একজন ফিল্ডার মাশরাফির অবদান যে অনেক। ফর্মে থাকা শোয়েব মালিক চতুর্থ উইকেটে ইমামের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। ৬৭ রান যোগ করেন এই দুজন। রুবেলের বলে ৩০ রান করা মালিককে দুর্দান্ত ক্যাচে ফেরান মাশরাফি। এরপর সাদাব খানকে ফিরিয়ে সৌম্য সরকার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথম উইকেটের স্বাদ পেলে ৯৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বসে পাকিস্তান।

ষষ্ঠ উইকেটে আসিফ আলিকে সঙ্গে নিয়ে ইমাম-উল-হক আবার যোগ করেন ৭১ রান। যখন ম্যাচে ফেরার টার্নিং পয়েন্টে তারা, তখনই আসিফকে ফেরান মিরাজ। কৃতিত্ব অবশ্য উইকেটরক্ষক লিটন দাসেরও। দুর্দান্ত স্টাম্পিং ছিল তার। তার আগে অবশ্য মুশফিকুর রহীমের পরিবর্তে উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে সহজ এক ক্যাচ ছেড়েছিলেন। সেটির প্রায়শ্চিত্ত করেন পরে আরো একটি স্টাম্পিং করে। মাহমুদউল্লাহর বলে ইমাম-উল-হককে প্যাভিলিয়নের পথ ধরান। ৮৩ রান করে টাইগারদের গলার কাঁটা হয়েছিলেন তখন ইমাম।

এরপর হাসান আলি ও মোহাম্মদ নওয়াজকে ফেরান মোস্তাফিজ। ম্যাচে ৪ উইকেট নিয়েছেন আগের ম্যাচে শেষ ওভারে দলকে জয় এনে দেওয়া এই পেসার। শেষ উইকেট জুটিটা ভাঙতে পারলে অবশ্য ৫ ‍উইকেট পেতেনই। লিটন দাসকেও অবশ্য দায়ী করা যেতে পারে এক্ষেত্রে। মোস্তাফিজের করা ৪৬তম ওভারে শাহিন শাহ আফ্রিদির ক্যাচ ফেলেছেন তিনি।

মোস্তাফিজের ৪ উইকেট ছাড়াও ২ উইকেট পেয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ১০ ওভারে ব্যায় করেছেন মাত্র ২৮ রান। ১টি করে উইকেট নিয়েছেন রুবেল হোসেন, মাহমুদউল্লাহ ও সৌম্য।

এর আগে অনেক প্রতিকূলতাকে পিছনে ঠেলে দলকে লড়ার পুঁজিটা এনে দেন মুশফিকুর রহীম ও মোহাম্মদ মিঠুন। এশিয়া কাপের অন্য ম্যাচগুলোর মতো এদিনও দ্রুত উইকেট হারায় টাইগাররা। ১২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তো শুরুতেই ম্যাচ থেকে প্রায় ছিটকে যায়। সেখান থেকে দলকে টেনে তুলেন এই দুজন।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে এই দুজন গড়েছিলেন ১৩১ রানের জুটি। এদিন চতুর্থ উইকেট গড়েন ১৪৪ রানের জুটি। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফিফটি তুলে মিঠুন ৬০ রান করে ফিরেন। আর মুশফিককে ৯৯ রানে কাটা পড়ার জ্বালা সইতে হয়েছে। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ৯৯ রানে আউট হন তিনি। এশিয়া কাপের আসরেও এই রেকর্ডে প্রথম হতভাগা তিনিই। মুশফিক তার ইনিংসটি খেলেছেন ১১৬ বলে ৯টি চারে। মিঠুনের ৮৪ বলের ইনিংসে ছিল ৪টি চার।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শেষটা অবশ্য মুশফিকের ৯৯ রানে আউট হওয়ার মতোই আফসোসের হয়ে আছে। ৫ উইকেটে হাতে নিয়ে শেষ ১০ ওভার শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু ৭ বল বাকি থাকতেই অল আউট হওয়ার আগে যোগ করতে পারে মাত্র ৫২ রান।

পাকিস্তানের পক্ষে সর্বাধিক ৪ উইকেট নেন জুনাইদ খান। ২টি করে উইকেট নেন শাহিন শাহ আফ্রিদি ও হাসান আলি। ১ উইকেট নেন শাদাব খান।

এডিটর-ইন-চিফ : মাহমুদ হাসান সোহেল
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : আবু বকর সিদ্দিক সাগর
নিউজরুম মেইল: khulnanews24@gmail.com এডিটর ইমেইল : editor@khulnanews.com
Khulna Office : Chamber Mansion (5th Floor), 5 KDA C/A, Jessore Road, Khulna 9100,
Dhaka Office : 102 Kakrail (1st Floor), Dhaka-1000, Bangladesh.
কপিরাইট © 2009-2020 KhulnaNews.com